‘অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি’

জ্বালানি তেল নিতে এসে ঠেলে নিজের মোটরসাইকেল সারির একেবারে শেষে নিয়ে যাচ্ছেন এই চালক। রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে। আজ মঙ্গলবার দুপুরেছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১১টা। মাথার ওপর সূর্যের তাপ ক্রমেই প্রখর হয়ে উঠছে। রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনের সামনে তখন জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য গাড়ি ও মোটরসাইকেলের লম্বা সারি। সেখানে নিজের স্কুটি নিয়ে এসে দাঁড়ান মাহমুদা বেগম। রাজধানীর কাকরাইলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি।

সারিতে দাঁড়ানো অবস্থায় আজ মঙ্গলবার মাহমুদার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের। মাহমুদা যখন সারিতে এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর সামনে শতাধিক মোটরসাইকেল। তিনি বলেন, এখানে আসার আগে তিনি রমনা ফিলিং স্টেশনে গিয়েছিলেন। সেখানে আরও লম্বা সারি দেখে এখানে এসে দাঁড়িয়েছেন।

আরও পড়ুন

মাহমুদা বলেন, ‘নারীদের আলাদা লাইন হলে ভালোই হতো। কারণ, আমাদের অনেক কাজ থাকে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসতে হয়। অফিস আছে।’

তেলের অপেক্ষায় থাকা এই নারী আরও বলেন, ‘আজ আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছি। বিকেলে অফিস শেষের পর এলে অকটেন পাব না। বলবে, শেষ হয়ে গেছে।’

নিজের স্কুটি নিয়ে জ্বালানি তেল কিনতে এসে সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন মাহমুদা বেগম। রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনের সামনে। আজ বেলা ১১টার দিকে
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

মাহমুদার দুই সন্তান—আদিয়াত ও মাহেদ। প্রতিদিন সকালে দুজনকে স্কুটিতে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতে হয়। এরপর অফিসে যান তিনি। মাহমুদা বলেন, ‘সকালে যদি বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে আসতে না হতো, শুধু আমার অফিস থাকত, তাহলে হেঁটে কিংবা রিকশায় যেতাম। এখন তো সেটা করা সম্ভব নয়। সময় মেনে সবকিছু সামলাতে আমাকে স্কুটি ব্যবহার করতেই হয়।’

আরও পড়ুন

কর্মজীবী এই নারী আরও বলেন, তেলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তারপরও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র ২০০ টাকার তেল দেয়। তাই কয়েক দিন পরই তেলের জন্য আবার এসে দাঁড়াতে হয়। সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে তেলের নেওয়ার সারিতে বেলা ১১টায় ১১৩টি মোটর সাইকেল ও ৫৪টি প্রাইভেটকারকে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।

সারিতে দাঁড়িয়ে রোদ থেকে বাঁচতে মাথায় ছাতা ধরেছেন এই মোটরসাইকেলচালক। রাজধানীর পরীবাগের মেঘনা সার্ভিসিং সেন্টার অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের সামনে। আজ বেলা ১টা ২০ মিনিটে তোলা
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনের সামনে বড় জটলা। সেখানেও লম্বা সারি। সারিতে তেল নেওয়ার অপেক্ষায় ২০৭টি মোটরসাইকেল ও ১৫৯টি প্রাইভেট কার ছিল। প্রাইভেটকারের সারি আরামবাগ থেকে ফকিরাপুল মোড় ঘুরে রাজারবাগ পুলিশ বক্স হয়ে এজিবি কলোনির কাঁচাবাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকিরুল ইসলাম। কখন এসেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সকাল সাতটার দিকে।

খানিকটা ক্ষোভ জানিয়ে জাকিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘চার ঘণ্টার বেশি পেরিয়ে গেলেও পাম্পে তেল আসেনি। কী করবে, তেল না নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় আছে? তেল নিতেই হবে। তাই কষ্ট হলেও অপেক্ষা করছি।’

জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় গাড়ির লম্বা সারি। রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে। আজ দুপুরে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স পাম্পে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে মোটরসাইকেল ও গাড়ির সারি আরও লম্বা। মোটরসাইকেল ২২৩টি আর প্রাইভেট কার ১৭৫টি। মতিঝিল থেকে শুরু করে মোটরসাইকেলের সারি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবন ছাড়িয়ে গেছে। প্রাইভেট কারের সারিও মতিঝিল থেকে শুরু হয়ে দৈনিক বাংলা মোড় পেরিয়েছে।

দৈনিক বাংলা মোড়ের বিনিময় ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ‘অকটেন নেই’ লেখা বোর্ড ঝুলছে। মৎস্য ভবন মোড়ে রমনা ফিলিং স্টেশনে দুপুর সাড়ে ১২টার পর দেখা গেল, ২৮৯টি মোটরসাইকেল ও ২০৬টি প্রাইভেট কার তেলের জন্য সারিতে অপেক্ষায় আছে। ব্যক্তিগত গাড়ির লম্বা সারি মৎস্য ভবন মোড় থেকে শুরু হয়ে সেগুনবাগিচা–প্রেসক্লাব হয়ে আবার মৎস্য ভবনের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

জ্বালানি তেল নিতে এসে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিয়ে লম্বা সারিতে অপেক্ষা। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে। আজ সকালে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা বেলা ১টা ২০ মিনিটে ছুঁয়েছে। রাজধানীর পরীবাগের মেঘনা সার্ভিসিং সেন্টার অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা গেল, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের লম্বা সারি। সেখানে কথা হয় প্রাইভেট কারচালক লোকমান ফকিরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল পৌনে ছয়টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এত সময় পরও তেল পাইনি।’ লোকমান যখন এ কথা বলছিলেন, তখন তাঁর সামনে আরও পাঁচটি গাড়ি। এরপর তেল পাবেন তিনি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

পরিবাগের এই ফিলিং স্টেশনে বিকেল ৫টার দিকে গিয়ে দেখা যায় ৩৭৫টি মোটরসাইকেল, ১৯৪ টি প্রাইভেট কার ও মালবাহী একটি গাড়ি তেলের জন্য অপেক্ষায়।