যে কারণে বন্ধ হচ্ছে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকান ‘জিনাত বুক’

জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

২০৭ বর্গফুটের দোকানটির তাকে হাজার হাজার আমদানি করা ইংরেজি বই। বই কেনার জন্য দোকানের বাইরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। রাজধানীর নিউমার্কেটে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করা জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের একসময়ের চিত্র এটি। যত দিন গেছে, জৌলুশ হারিয়েছে দোকানটি। ৩০ এপ্রিলের পর থেকে এটি বন্ধই হয়ে যাচ্ছে।

বইপোকাদের গোড়াপত্তনে ভূমিকা রাখা জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড অনেকের কাছে শুধু বইয়ের দোকান ছিল না; বই পড়তে ভালোবাসেন, কিন্তু পকেটে টাকা নেই—এমন পাঠকেরা এখান থেকে বই নিয়ে পড়ে আবার ফেরত দিতে পারতেন। বাকিতে বই নিয়ে যেকোনো সময় তা পরিশোধ করার সুযোগ পেতেন ক্রেতারা।

পাঠকদের অনেকেরই ছোটবেলায় কমিকসের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে জিনাত বুকের হাত ধরে। এরপর একের পর এক বইয়ের রাজ্যে নিয়ে গেছে জিনাত বুক। এক প্রজন্ম থেকে কয়েক প্রজন্মে ছড়িয়েছে বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পাঠকদের স্মৃতিচারণা চলছে কয়েক দিন ধরে।

জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের কর্ণধার সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালেরও মন ভালো নেই। তবে একরকম নিরুপায় হয়েই তিনি বন্ধ করে দিচ্ছেন দোকানটি।
জিনাত বুকের যখন রমরমা অবস্থা, তখন মানুষের হাতে হাতে মুঠোফোন ছিল না। ডিশের লাইন ছিল না, বিনোদনেরও তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। তখন ছোটরা বাবা, মা, দাদা, দাদি, নানা, নানির হাত ধরে বইয়ের দোকানে যেত। বই কিনত, বই পড়ত। দোকানটির কদর ছিল।

জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টিয়েছে। ভালো পাঠকের সংখ্যা কমেছে। এর সঙ্গে মূল বইকে ফটোকপি করে কম দামে বিক্রি এবং বইয়ের পাইরেসির কারণে মূল বইয়ের চাহিদা কমতে থাকে। অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা, আমদানি করা বইয়ের শুল্কও জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল শারীরিকভাবেও অসুস্থ।

সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালের দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে বিয়ে করে লন্ডনে স্থায়ী হয়েছেন। আরেক মেয়ে চাকরির পাশাপাশি এই ব্যবসায় সময় দিতে পারছেন না। ২০১৬ সাল থেকে প্রতি মাসেই বইয়ের দোকানটি থেকে লাভের পরিবর্তে লোকসান বাড়ছিল। লোকসান গুনতে হচ্ছিল মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।

সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘ঘর থেকে টাকা এনে দোকানের খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থায় পড়তে হয়েছে। অনলাইনে বই বিক্রি শুরু করলে হয়তো আরও কয়েক বছর ব্যবসাটা ধরে রাখা যেত। তবে দোকানের কর্মীর কারও বয়স ৭৩ বছর, আবার কেউ ৩২ বছর ধরে কাজ করছেন। এসব কর্মী অনলাইন ব্যবসায় অভ্যস্ত নন। তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন কর্মী দিয়ে ব্যবসা চালানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হতে পারিনি। কর্মীদের ধরে রাখতে গিয়ে এখন নিজেই পড়ে গেলাম।’

বইয়ের দোকানের কর্ণধার সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল
ছবি: সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালের সৌজন্যে

ফেসবুকে স্মৃতিচারণায় বেশির ভাগ বইয়ের ক্রেতা বা পাঠক লিখেছেন, সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল শুধু একজন বই বিক্রেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো। যিনি আলগোছে সন্তানের হাতে বিশ্ব সাহিত্যের ভান্ডার তুলে দিতেন।

গত শনিবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়ির চারতলায় বসে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বই বিক্রির চেয়েও আমি পাঠক তৈরি করতে চেয়েছি। আমি পাঠক তৈরি করতে পেরেছি, এটাই আমার বড় অর্জন।’

প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলার সময় একাধিক পাঠক মুঠোফোন করে দোকানটি কেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে মন খারাপ করছিলেন।

যাত্রা শুরুর গল্প

১৯৫৫ সালে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালের জন্ম। তাঁর বাবা সৈয়দ আবদুল মালেকের হাত ধরে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দোকানটির যাত্রা শুরু হয়। বড় মেয়ে জিনাতের (বর্তমান নাম জিনাত সালাদ্দিন) নামে দোকানের নামকরণ করা হলেও দোকানটি কেনা হয়েছিল সৈয়দ আবদুল মালেকের স্ত্রী খন্দকার আশরোফা খাতুনের নামে। সৈয়দ আবদুল মালেক ও তাঁর স্ত্রী ১৯৪৭ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকার গ্র্যান্ড এরিয়া, যা বর্তমানে গেন্ডারিয়া নামে পরিচিত, সেখানে এসে স্থায়ী হন। সরকারি চাকরির পাশাপাশি সদরঘাটের নিউমার্কেট নামক জায়গায় মুর্শিদাবাদ সিল্ক ক্লথ স্টোর নামের একটি শাড়ির দোকান চালান ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে নিউমার্কেটের গেটের নকশা করা প্রকৌশলী শরীফ ইমাম ছিলেন সৈয়দ আবদুল মালেকের আত্মীয়। ১৯৬৩ সালে তিনিই বইয়ের দোকান খোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে পরিবারের সিদ্ধান্তে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালের নামে জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডকে হস্তান্তর করা হয়। তবে দোকানের নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

পেছনের গল্প

সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল দোকানে বসা শুরু করেছিলেন ১৯৭৪ সালের শেষ দিক থেকে। তখন বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সংসারের খরচ চালানোর জন্য আয়ের অন্য কোনো বিকল্প উৎস নেই। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল মেজ।

পরিবারের সিদ্ধান্তেই এইচএসসি পর্যন্ত পড়ুয়া সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালকে দোকানের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। বললেন, ‘বইয়ের পাতায় মুখ লুকিয়ে কাঁদতাম।’ বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা সিনোপসিস বা সারাংশ পড়া সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালের নেশা। এ পর্যন্ত কত বইয়ের সারাংশ পড়েছেন তার হিসাব নেই। ফলে দোকানে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। কে কোন বই পছন্দ করবেন, তা বুঝতে পারতেন।

জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল যখন দোকানে বসা শুরু করেন, তখন দোকানের অবস্থা বেশ খারাপ। মাত্র দুই লাখ টাকায় দোকানটি বিক্রি করে দেওয়ারও কথা উঠেছিল। দেনা পরিশোধ করে সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজে গিয়ে বই পৌঁছে দিতেন, বিল পেতেন অনেক পরে। শুধু পাঠক তৈরির জন্য অনেককে বাকিতে বই দিতেন। তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, ‘সেই দোকানে বসা থেকে শুরু করে বিশ্বাস করে যাঁদের বাকিতে বই দিয়েছি, তাঁদের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ ব্যবসায়ী ঠকিয়েছেন, যা টাকার অঙ্কে দুই থেকে তিন লাখ টাকা হবে। সেই তুলনায় এই সময়ে কত যে পাঠক তৈরি হয়েছে, তার তো হিসাব নেই।’

ক্রেতা ছিলেন যাঁরা

পর্তুগালে থাকা বিজ্ঞানী কে এম মোস্তফা আনোয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সেই আশির দশকের কথা লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, বইয়ের দোকানের সামনে ঘুরঘুর করছিলেন। তখন সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল জানতে চেয়েছিলেন, বিশেষ কোনো বই পছন্দ হয়েছে কি না? চোখের সামনে ওয়ার্ল্ড অব ফিজিকসের তিনটি খণ্ড, দাম ৩ হাজার ৯০০ টাকা। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যায় পড়ুয়া তরুণের কাছে ২০০ টাকার বই কেনারও সামর্থ্য ছিল না তখন।

অথচ চেনাজানা নেই, এমন একজনকে পুরো সেট বই নিয়ে যেতে বলেছিলেন বিক্রেতা। পরে দাম শোধ করতে বলেছিলেন। টিউশনি করে দুই বছরের বেশি সময় লেগেছিল সেই বইয়ের দাম পরিশোধ করতে। এরপর নোবেলজয়ী পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের তিন খণ্ডের ফিজিকস লেকচারের ভারতীয় সংস্করণ বের হলে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল ডেকে বইটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন।
কে এম মোস্তফা আনোয়ার লিখেছেন, ‘আজকের আমি হিসেবে গড়ে তুলতে বই বিক্রেতা সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তার ঋণ তিনি কোনো দিন শোধ করতে পারবেন না।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অনিক আর হক তাঁর ফেসবুকে বইয়ের দোকানটিকে নিয়ে একটি পোস্টে ক্ষমতা থাকলে তিনি নিজে কিনে দোকানটিকে বাঁচানোর কথা লিখেছেন। ছোটবেলায় মা অধ্যাপক অনামিকা হক লিলির সঙ্গে বইয়ের দোকানটিতে গিয়ে কমিকস টিনটিনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। স্কুলে পড়ার সময় বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয়ও ওই দোকান থেকেই। কলেজে পড়ার সময় দোকানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ক্ল্যাসিক সাহিত্যের অনেক বই পড়ে শেষ করেছিলেন।

অনিক আর হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনের কোনো বই লাগবে, ভারত থেকে তা এনে দিতেন সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি এবং তাঁর দোকানের কর্মীদের আন্তরিক ব্যবহার, নানা বিষয়ে গল্প করা এবং দুর্লভ বইয়ের সন্ধান পাওয়া যেত দোকানটিতে। দোকানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য ঠেকছে।’

বইয়ে জিনাত বুকের এই সিল আর দেখা যাবে না
ছবি: প্রথম আলো

শুধু বইয়ের ক্রেতারা স্মৃতিচারণা করছেন, তা-ই নয়। সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল নিজেও তাঁর পাঠকদের নিয়ে স্মৃতিচারণা করলেন। তিনি বললেন, ‘কতজনের নাম বলব? চাইলে হাজার পাঠকের নাম বলতে পারব, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে দোকানে এসে দাঁড়িয়েই অনেক বই পড়তেন। বই কিনতেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ, প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মহাবুবুর রহমান খান, ব্যারিস্টার নিহাদ কবির,...এমন অনেক নাম আছে।’

স্মৃতি হয়ে যাবে জিনাত বুক স্টোর

জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের দোকানটি ভাড়া দিয়েছেন সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে দোকান খালি করে দিতে হবে। দোকানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত উবায়েদ হোসেন, মকবুল হোসেন, মফিজ উদ্দিন সর্দার জানালেন, এখনো দোকানটিতে প্রচুর বই রয়ে গেছে। ৪০ শতাংশ ছাড়ে বইগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ব্যবসায় লোকসানের কথা উল্লেখ করে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘পাইরেসি বই বিক্রি হয় হয়তো ১ হাজার ৫০০ টাকায়। আর আমদানি করা মূল বইয়ের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য ওই বই বিক্রি করতে হতো ১ হাজার ৭৯০ টাকায়। এভাবে তো আর ব্যবসা চলে না।’

যাঁর নামে এই দোকান, সেই জিনাত সালাদ্দিন হোয়াটসঅ্যাপে ভাই আবু সালেহকে বলেছেন, এটি শুধু দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল বিদ্যা ও জ্ঞানের পাঠাগার। সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল শেষ পর্যন্ত এর সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছেন।