ঢাকাকে ঘিরে বৃত্তাকার নৌপথে ১২২ কোটি টাকা গচ্চা, আবার চালুর উদ্যোগ

  • বৃত্তাকার নৌপথে সরকারের ব্যয় প্রায় ১২২ কোটি টাকা। আয় ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

  • ল্যান্ডিং স্টেশনগুলো যেন ‘ভূতের বাড়ি’। সদরঘাটে পড়ে আছে ওয়াটার বাস।

বিআইডব্লিউটিসির ১২টি ওয়াটার বাসের ৯টিই অচল। সেগুলো পুরোনো লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছে। রাজধানীর সদরঘাটেছবি: তানভীর আহাম্মেদ

রাজধানীর আমিনবাজার সেতুর গাবতলী অংশের পাশ দিয়ে বেড়িবাঁধ সড়ক গেছে আশুলিয়ার দিকে। সেই সড়ক ধরে ১৪ কিলোমিটারের মতো যাওয়ার পর তুরাগ নদের তীরে একটি ‘ল্যান্ডিং স্টেশন’ পাওয়া যায়।

ল্যান্ডিং স্টেশন হলো নৌযান থামার স্থান। দোতলা ভবন, পন্টুন ও পন্টুনে যাওয়ার সিঁড়ি—এই তিনে মিলে ল্যান্ডিং স্টেশন।

ল্যান্ডিং স্টেশনে একসময় সরকারি ‘ওয়াটার বাস’ থামত। যাত্রীরা তাতে যেতেন সদরঘাট। খরচ কম, যানজট নেই—সাশ্রয়ী ও স্বাচ্ছন্দ্যের যাত্রা।

বর্ষার পানিতে টইটুম্বুর তুরাগ নদের ওপর টঙ্গি রেলসেতু। ৩ আগস্টে তোলা।
ছবি: প্রথম আলো

সরেজমিনে গত সোমবার দেখা যায়, ল্যান্ডিং স্টেশন ভবনের ফটক খোলা। তবে ভেতরে কেউ নেই। পন্টুন ঘিরে কচুরিপানা। দেখেই বোঝা যায় সেখানে বহুদিন নৌযান থামেনি। সেবাটি চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৬ সালের দিকে।

আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ‘ওয়াটার বাস’ সেবা ছিল ঢাকাকে ঘিরে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর পরিকল্পনার অংশ। বর্তমান সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া এই সেবা আবারও চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

১২টি ওয়াটার বাসের মধ্যে ৯টি পুরোনো লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।

২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নদীপথ সচল করার নির্দেশ দেন। নদীগুলোর দূষণ প্রতিরোধ, শহরের পয়োনিষ্কাশন (ড্রেনেজ) ব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর নাব্যতা ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার কথাও বলেছেন তিনি।

অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে, অতীতে শতকোটি টাকা খরচের পর যে প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে, সেই সেবা আবার চালু করলে কী লাভ?

বৃত্তাকার নৌপথে কত ব্যয়

রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু—এই চার নদ–নদী এবং ১১০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। মনে করা হয়, এই নদীগুলো ব্যবহার করে যদি ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌযান চলাচল চালু করা যায়, তাহলে ঢাকার ভেতরে সড়কপথে যানবাহনের চাপ কমবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা গেছে, বৃত্তাকার নৌপথ চালু ও নৌযান নামাতে ২০০০ সালে প্রথম প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে এই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাময়িকীতে ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘ঢাকার বৃত্তাকার নৌপরিবহনব্যবস্থা: বর্তমান অবস্থা, সমস্যা ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ’ শিরোনামের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ব্যয় হয় ৩৬ কোটি টাকা। এর আওতায় আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সাড়ে ২৯ কিলোমিটার নৌপথ খনন এবং ১০টি ল্যান্ডিং স্টেশন, ৭টি টার্মিনাল ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরি করা হয়।

তুরাগ নদের ওপর পুরোনো সেতুর পাশে নির্মাণাধীন সেতু। ৩ আগস্ট তোলা।
ছবি: প্রথম আলো

দ্বিতীয় ধাপের কাজ হয় ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে। ব্যয় হয় সাড়ে ৪৭ কোটি টাকা। এর আওতায় আশুলিয়া থেকে টঙ্গী হয়ে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার নৌপথ উন্নয়নের কাজ করা হয়। নির্মাণ করা হয় তিনটি ল্যান্ডিং স্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো।

দুই ধাপে এই প্রকল্পে ব্যয় করা হয় সাড়ে ৮৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিসি সূত্র বলছে, ওয়াটার বাস কেনা ও পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে বৃত্তাকার নৌপথে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২২ কোটি টাকা। যদিও বিপরীতে আয় হয় মাত্র ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

পুরো ১১০ কিলোমিটার পথে কখনোই যাত্রী পরিবহন সেবা চালু হয়নি। এর কারণ নৌপথে নিচু সেতু। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী নদ-নদীর ওপর প্রায় ২৫টি সড়কসেতু ও ৩টি রেলসেতু রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি সেতুরই উচ্চতা কম। পুরো পথে নৌযান সেবা চালু করতে হলে অনেক সেতু ভেঙে ফেলতে হবে।

ওয়াটার বাস চালু, বন্ধ

২০০৪ সালে আশুলিয়া থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পথে দুটি ছোট লঞ্চ দিয়ে প্রথম ‘ওয়াটার বাস’ সেবা উদ্বোধন করা হয়। যদিও কিছুদিন পর ওই সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

২০১০ সালের ‘এমভি বুড়িগঙ্গা’ ও ‘এমভি তুরাগ’ নামে দুটি ‘ওয়াটার বাস’ এই রুটে নামানো হয়। ২০১৪ সালে দুই ধাপে নামানো হয় আরও ১০টি ওয়াটার বাস।

সব মিলিয়ে নামানো হয়েছিল ১২টি ওয়াটার বাস। ২০১৪ সালের শেষ দিকে দুটি ওয়াটার বাস গাবতলী–সদরঘাট রুট থেকে সরিয়ে নিয়ে টঙ্গী-নারায়ণগঞ্জ নৌপথে নিয়ে চালানো হয়। যদিও তা বছরখানেকের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়।

বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ওয়াটার বাস সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ যাত্রী না হওয়া। যাত্রী না হওয়ার বড় কারণ দূষিত নদী। ওয়াটার বাসের যাত্রীরা দুর্গন্ধের কারণে নৌপথে চলাচল করতে চাইতেন না। আরও নানা সমস্যা ছিল। ২০১৭ সালে বিআইডব্লিউটিসি গঠিত একটি কমিটি বুড়িগঙ্গার পানি দুর্গন্ধমুক্ত করা, ঘাটে যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন, নদীর উভয় পাড়ে হাঁটার পথ নির্মাণ, ওয়াটার বাসে পর্যাপ্ত লাইট–ফ্যান ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল।

গাবতলি সেতুসংলগ্ন গাবতলি ল্যান্ডিং স্টেশনের দুটি কক্ষের একটিতে বাশের তৈরি জিনিসপত্র রাখা। বারান্দায় এসব জিনিসপত্র তৈরি করছেন কয়েকজন।
ছবি: প্রথম আলো

যাত্রীরা কেউ কেউ ভিন্ন কথাও বলছেন। ওয়াটার বাসে গাবতলী থেকে সদরঘাট পথে যাতায়াত করতেন মিরপুরের ফল ব্যবসায়ী তৌহিদ হোসেন। কারণ, বাদামতলীর আড়ত থেকে তাঁকে নিয়মিত ফল কিনতে হয়। বেঁড়িবাধে নিজের ফলের দোকানে বসে ৩ আগস্ট তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাসের চেয়ে ওয়াটার বাসে ভোগান্তি বেশি ছিল। কারণ, ওয়াটার বাস ভর্তি হওয়ার পরও চালকের খোঁজ পাওয়া যেত না। তিনি বলেন, ‘সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ওয়াটার বাসে চলাচল করতাম। সেই সময় ঘাটেই লেগে যেত। এ কারণে সেটি জনপ্রিয়তা হারায়।’

গাবতলী ঘাটে ২০ বছর ধরে কর্মরত লস্কর মো. বাবুল বলছেন একই কথা। তিনি ৩ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, সত্যি কথা বলতে, যাত্রীর কোনো অভাব ছিল না। মাইকে ডাক দিলে মানুষ চলে আসত। কিন্তু যাত্রীরা এসে বসে থাকতেন, চালকদের খোঁজ থাকত না। অনেক সময় যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে ওয়াটার বাস থেকে নেমে যেতেন।

বিক্রি হবে ওয়াটার বাস

বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, লোকসানের মুখে ২০১৬ সালে ‘বুড়িগঙ্গা’ নামের বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়াটার বাস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারাও ব্যর্থ হয়। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, সদরঘাটে যাত্রী পারাপারে ডিঙিনৌকার বদলে ওয়াটার বাস সেবা দেওয়া হবে। এ জন্য ২০২০ সালে কেরানীগঞ্জ–বুড়িগঙ্গা নৌকা মাঝি শ্রমিক শ্রমজীবী সমবায় সমিতিকে ছয় মাসের জন্য আটটি ওয়াটার বাস ইজারা দেওয়া হয়। তবে লোকসানের পর তারাও ওয়াটার বাসগুলো ফিরিয়ে দেয়।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটি এখন ওয়াটার বাসগুলো পুরোনো লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। ১২টি ওয়াটার বাসের ৯টি বিক্রি করা হবে। বাকি তিনটি আরিচা-কাজীরহাট নৌপথে চলাচল করছে।

পুরান ঢাকার বাদামতলী ঘাটে গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচটি ওয়াটার বাস জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। জানালার কাচ ভাঙা। কোনোটির আসন রয়েছে, তবে ভাঙাচোরা। কোনোটিতে আসনই নেই, খুলে নিয়ে গেছে চোরেরা।

বাকি চারটি ওয়াটার বাসের মধ্যে দুটি নারায়ণগঞ্জ ও দুটি চট্টগ্রামে রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যানগুলোর ফিটনেস না থাকায় বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে।

বৃত্তাকার নৌপথকে কেন্দ্র করে যে ল্যান্ডিং স্টেশনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলো এখন অনেকটা ‘ভূতের বাড়ি’। ৩ আগস্ট আশুলিয়া, সিন্নিরটেক ও গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

নতুন করে চালুর উদ্যোগ

ঢাকার চারপাশে নৌপথ চালু নিয়ে ২ আগস্ট সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিশেষ সভাকক্ষে একটি সভা হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবেরা উপস্থিত ছিলেন।

বাসস এক প্রতিবেদনে জানায়, বৃত্তাকার নৌপথে ওয়াটার বাস সেবার দায়িত্ব এবার বিআইডব্লিউটিসিকে দেওয়া হবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যারা আগ্রহী, তাদের এ দায়িত্ব দেওয়া হবে। আর সার্বিক বিষয়াদি সমন্বয় করবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে। শুরুতে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত নৌপথে ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, নদীদূষণ ঠেকাতে পারলে, প্রচার বাড়াতে পারলে এবং সবার সহযোগিতা থাকলে এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।

‘তাড়াহুড়া করা যাবে না’

ঢাকায় নৌপথ যে জনপ্রিয় হতে পারে, তার উদাহরণ হাতিরঝিল। হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সিতে এফডিসি প্রান্ত থেকে গুলশান–১ যাওয়া যায়। সাত কিলোমিটার পথে ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা। হাতিরঝিলের দুর্গন্ধের মধ্যেও মানুষ এই সেবা ব্যবহার করছেন।

ওয়াটার ট্যাক্সি সেবার এফডিসি জেটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তানিম হোসেন গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, দিনে তাঁদের ১০–১৫ হাজার যাত্রী হয়।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃত্তাকার নৌপথ জনপ্রিয় করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। অস্থায়ী ভিত্তিতে, আংশিকভাবে কাজ করা হলে সুফল পাওয়া যাবে না। এতে শুধু অর্থের অপচয় হবে। ব্যক্তির ইচ্ছায় কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ডেমু ট্রেন কেনা হয়েছিল। ওয়াটার বাসের মতো সেগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, বৃত্তাকার নৌপথ আবার চালু করতে তড়িঘড়ি করে কোনো কাজ করা যাবে না। অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছরের একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগোতে হবে।