ঈদের আগে বাড়তি আয়ের খোঁজে তাঁরা

ছুরি-বঁটি ধার দেওয়ার কাজ খুঁজছেন দুই বন্ধু ইমদাদুল ও নাজমুল। গতকাল রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছেন দুই বন্ধু ইমদাদুল (১৮) ও নাজমুল (১৯)। ছুরি–বঁটি ধার করার যন্ত্র ঘাড়ে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। পেশায় দুজনই রাজমিস্ত্রির সহযোগী। ঈদের আগে ঢাকায় এসেছেন বাড়তি কিছু আয়ের আশায়।

গতকাল সোমবার দুপুরে দুই বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায়। সবেমাত্র তাঁরা তখন বেরিয়েছেন কাজের আশায়। কথায় কথায় জানালেন, দুজনের বাড়িই হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। দুজনেরই বাবা মারা গেছেন আরও আগে। ফলে ছোট বয়স থেকেই হাল ধরতে হয়েছে পরিবারের। নির্মাণকাজের পাশাপাশি দুজনই কয়েক বছর আগে শিখেছেন ছুরি–বঁটি–দা ধার দেওয়ার কাজ। কয়েক বছর ধরে এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে কোরবানির ঈদের আগে চলে আসেন ঢাকায়।

ইমদাদুলের ভাষায়, ‘প্রতিবার ঢাকাত আয়ি, কয়ডা বেশি পয়সা যদি অয়।’তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, দা–বঁটি–ছুরি ধার করাতে টাকার পরিমাণ ভিন্ন। ছুরি ধার করতে সর্বনিম্ন ২০ টাকা লাগে। আর বড় সাইজের বঁটি দেড় শ টাকা। তবে যদি অবস্থা বেশি খারাপ থাকে, তাহলে টাকা কিছু বেশি লাগে।

বড় বিষয় হইছে ভাইগ্যো। মালিকে (আল্লাহ) যদি কাজ দেয়, ঠিকমতো কাজ করতা পারি। তাইলে অইব।
ইমদাদুল

তবে এবার কাজ কম বলে জানালেন নাজমুল। এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার ধানমন্ডি, বাসাবো, মতিঝিল, ওয়ারী, আজিমপুর এলাকা ঘুরেছেন তাঁরা। কিন্তু কাজ তেমন মেলেনি। এর মধ্যে গত দুই দিন বৃষ্টির কারণে এক বেলা করে কাজে বের হতে পারেননি।

ঢাকায় আসা, থাকা–খাওয়া, আবার হবিগঞ্জে ফিরতে খরচ কম নয়। কাজ ভালো না পেলে দুই বন্ধুকেই ফিরতে হবে খালি হাতে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও ভাগ্যের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন দুই বন্ধুই। নাজমুল বলেন, ‘বড় বিষয় হইছে ভাইগ্যো। মালিকে (আল্লাহ) যদি কাজ দেয়, ঠিকমতো কাজ করতা পারি। তাইলে অইব।’

গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয় কাঠমিস্ত্রি আলী হোসেনের সঙ্গে। তাঁর বয়স ৬০ পেরিয়েছে। জানালেন, কাঠের কাজ কমে গেছে। আয় নেই তেমন। কিন্তু মাস গেলে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের খরচ ঠিকই পাঠাতে হবে। ঈদের আগে এই দুশ্চিন্তা আরও বেশি।

‘মাছ–মাংস কিইনা খাওয়াইতে হইব’

প্রতিবছর কোরবানির জন্য সারা দেশ থেকে গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন পশু আনা হয় ঢাকায়। এসব পশুর খাবারের চাহিদা পূরণে খড়, ঘাস, ভুসি, খইল বিক্রি করেন একদল লোক। আবার গরু জবাইয়ের পর মাংস রাখার জন্য হোগলার পাটি, খাইট্টার ব্যবসায়ীও বনে যান অনেকে। তবে তাঁরা কেউই এসব পণ্যের স্থায়ী ব্যবসায়ী নন। তাঁদের প্রত্যেকেরই নানা রকম পেশা আছে। ঈদের আগে বাড়তি কিছু আয়ের আশায় এসব বিক্রি করেন তাঁরা।

কারওয়ান বাজার এলাকায় ভুসি, ঘাস বিক্রি করছেন আলী হোসেন। গতকাল বিকেলে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয় কাঠমিস্ত্রি আলী হোসেনের সঙ্গে। তাঁর বয়স ৬০ পেরিয়েছে। জানালেন, কাঠের কাজ কমে গেছে। আয় নেই তেমন। কিন্তু মাস গেলে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের খরচ ঠিকই পাঠাতে হবে। ঈদের আগে এই দুশ্চিন্তা আরও বেশি।

নোয়াখালীর গ্রামে আলী হোসেনের দুই মেয়ে, এক ছেলে এবং স্ত্রী আছেন। পুরো সংসারের ভার তাঁর কাঁধেই। এর ওপর রয়েছে ঋণ। তাই ঈদের আগে কিছু বেশি আয়ের আশায় কয়েক দিন ঘাস, খড়, আর ভুসি বিক্রি করছেন তিনি। বললেন, ‘পোলা–মাইয়াদের তো ঈদের সময় মাছ–মাংস কিইনা খাওয়াইতে হইব।’

ঈদের আগের রাতে ঘরে ফিরবেন আলী হোসেন। তাঁর আশা, এর আগেই মালামাল সব বিক্রি হয়ে যাবে। বললেন, ‘দুই–তিন দিন করলে হয়তো দুই–চাইর হাজার টেকা থাকব।’

নুরনবী প্রতিটি চাটাই বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ২২০ টাকায়। আর খাইট্টা বিক্রি করছেন আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তেঁতুলগাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো হয় খাইট্টা। কোরবানির গরুর মাংস কোপানোর জন্য ব্যবহার হয় সেটি। তিনি জানালেন, এবার তেঁতুল কাঠের দাম ‘অতিরিক্ত বেশি’। তাই গাব আর বরই কাঠের খাইট্টা এনেছেন বেশি।

‘প্যাটে খাইয়া বাইচ্চা আছি’

আলী হোসেনের দোকানের বেশ কয়েকটি দোকান পরেই চাটাই আর খাইট্টা নিয়ে বসেছেন নুরনবী। মৌসুমি ব্যবসায়ী তিনি। বেশির ভাগ সময় ফলই বিক্রি করেন। আর প্রতিবার ঈদের কয়েক দিন আগে বসেন চাটাই আর খাইট্টা নিয়ে।

নুরনবী প্রতিটি চাটাই বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ২২০ টাকায়। আর খাইট্টা বিক্রি করছেন আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তেঁতুলগাছের গুঁড়ি দিয়ে বানানো হয় খাইট্টা। কোরবানির গরুর মাংস কোপানোর জন্য ব্যবহার হয় সেটি। তিনি জানালেন, এবার তেঁতুল কাঠের দাম ‘অতিরিক্ত বেশি’। তাই গাব আর বরই কাঠের খাইট্টা এনেছেন বেশি।

প্রায় ২০ বছর ধরে ঈদের আগে কারওয়ান বাজারে এই ব্যবসা করছেন নুরনবী। এর মধ্যে গত বছর ব্যবসায় লস করেছেন তিনি। বললেন, ‘গ্যাছে বছর ধরা খাইছি। হাজার বিশেক টেকা।…এবারে আল্লায় দিলে হইব।’