বাংলাদেশের রাজনীতি ও নারী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ছিলেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। তবে রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক কাজের আড়ালেই থেকে গেছে তাঁর সেই প্রতিভার দিকগুলো। তাঁর জীবনের সংগ্রাম ও মানবিকতার জানা–অজানা দিকগুলো উঠে এসেছে এক প্রামাণ্যচিত্রে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে নির্মিত জোহরা: দুঃসময়ের কান্ডারি নামের প্রামাণ্যচিত্রটির প্রিমিয়ার প্রদর্শনী। প্রদর্শনী শুরুর আগে ছিল কবিতা আবৃত্তি, তাঁর প্রিয় গান আর মাকে নিয়ে তাঁর সন্তানদের আবেগময় কথামালা। প্রামাণ্যচিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন তরুণ নির্মাতা সন্দীপ কুমার মিস্ত্রী। তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিশিষ্ট নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল। প্রযোজনা করেছেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের চার সন্তান শারমিন আহমদ রিপি, সিমিন হোসেন রিমি, মাহজাবিন আহমদ মিমি ও তানজিম আহমদ সোহেল তাজ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই তানভীর মোকাম্মেলের ‘তাজউদ্দীনের শার্ট’ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন বাচিক শিল্পী নায়লা তারান্নুম কাকলি। দুটি গান শোনান মেহেরুন সুলতানা। সঞ্চালনা করেন তানভীর মোকাম্মেল।
দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেন শারমিন আহমদ। তিনি সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের জীবনের অনেক অজানা দিক তুলে ধরেন। জানালেন, তিনি খুব ভালো সাঁতারু ছিলেন। ভালো অ্যাথলেট ছিলেন স্কুল–কলেজ জীবনে। চমৎকার হাওয়াইয়ান গিটার বাজাতেন। বাদনশিক্ষা করেছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে। লেখালেখি করতেন। ‘উদয়ের পথে’ শিরোনামে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর লেখা সেই সময় সাপ্তাহিক বিচিত্রাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছিলেন বিয়ের পরে। পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসা শিক্ষাও নিয়েছেন। কাপাসিয়ার গ্রামের বাড়িতে তিনি দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসা করেছেন। দারুণ নৈপুণ্য ছিল তাঁর উল বুননের কাজে। দ্রুত সোয়েটারসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি করতে পারতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তিনি অনেক সোয়েটার বুনে শরণার্থীশিবিরে গিয়ে বিতরণ করেছেন।
সোহেল তাজও মায়ের স্মৃতিচারণা করেন। বাবার মৃত্যুর পরে গভীর অর্থসংকটে পড়েছিল তাদের পরিবার। শিশুকালে একটি খেলনার জন্য, একটি সাইকেল পাওয়ার জন্য তাঁর যে আকুতি, মায়ের কষ্টের সেই সব দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বারবার তাঁর কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে ওঠে। তিনি খুবই একটি মর্মস্পর্শী ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, বাবা তাজউদ্দীন আহমদের মরদেহ তাঁদের বাড়িতে আনার পরে অনেক সাংবাদিক বাড়ির সামনে সমবেত হয়েছিলেন। একসময় তাঁরা তাঁর মা জোহরা তাজউদ্দীনের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চান। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি স্বামী হারিয়েছি। আমার সন্তানেরা তাদের বাবাকে হারিয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশ কী হারাল, সেটি উপলব্ধি করতে হবে।’
১ ঘণ্টা ২০ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রে সৈয়দা জোহারা তাজউদ্দীনের ব্যক্তিজীবন, সংগ্রাম, সাংগঠনিক কর্মময়তা এসবের সঙ্গে উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ।