মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারের ভাঙা কক্ষে চলছে টিকাসহ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম, নেই পানি-বিদ্যুৎ
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের বেসরকারি মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আজ সোমবার তৃতীয় দিনের মতো সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলছে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেন্টারের একটি ভাঙা কক্ষের ভেতর শিশুদের টিকাদান শুরু হয়। এর আগে গত শনি ও রোববার সেন্টারের বাইরে সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হয়েছিল।
আজ সরেজমিনে দেখা যায়, সেন্টারটির একটি ভাঙা কক্ষে চেয়ার-টেবিল পেতে বসেছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। কক্ষের ভেতরে ৮ থেকে ১০টি চেয়ার রাখা। সেখানে টিকা নিতে আসা শিশু ও মায়েদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে কক্ষটিতে এখনো বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে গরমে শিশুসহ মায়েদের কষ্ট হচ্ছে। কয়েকটি শিশুকে কান্নাও করতে দেখা যায়।
সেন্টারের আশপাশে উৎসুক মানুষসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ভিড় রয়েছে। পাশাপাশি সেন্টারের অন্য কক্ষ ও ধ্বংসস্তূপ থেকে ভাঙা কংক্রিট, ইটের টুকরাসহ অন্যান্য সামগ্রী সরানোর কাজ চলছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলা কক্ষটির আশপাশে ধুলাবালু উড়ছে।
১৮ মাস বয়সী ছেলে আলিফ হোসেনকে নিয়ে সকালে টিকা দিতে এসেছিলেন মোহাম্মদ রনি। তিনি বলেন, ছেলের জন্মের আগে থেকেই তাঁর স্ত্রী এই কেন্দ্রে চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। ছেলের জন্মের পর তার সব টিকাও এখান থেকেই দেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ রনি বলেন, ‘যখন শুনলাম এটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তখন খারাপ লেগেছে। আমাদের মতো অনেক মানুষ এখানে কম খরচে চিকিৎসা নেয়, টিকা নেয়। আমরা চাই সরকার এই সবকিছু ঠিক করে দিক।’
সাড়ে চার মাস বয়সী ছেলে ফারহানকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছিলেন ফারজানা আক্তার। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা লাবনী বেগম। নাতিকে কোলে নিয়ে লাবনী বেগম বলেন, যারা এই কাজ করেছে, তারা খুব খারাপ কাজ করেছে। তাদের জন্য এখন ভাঙা ঘরে সেবা নিতে হচ্ছে। তাঁর নাতি গরমে কাঁদছে।
লাবনী বেগম বলেন, ‘তয় টিকা পাইসি, তাই ভালা লাগসে। যারা এই কাম করসে, তাগো বিচার চাই।’
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, ভাঙা একটি কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তবে এখনো স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়নি।
নাসরিন আখতার বলেন, ‘যেটুকু ময়লা ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। তবে এখনো পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচকাজের কোনো ব্যবস্থা এখানে হয়নি। এখানে সেবা নিতে মায়েরা আসেন, শিশুরা আসে। আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের বেশির ভাগই নারী। তাঁদের সেবা দেওয়ার পরিবেশ, স্বাচ্ছন্দ্য—সেই পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।’
নাসরিন আখতার আরও বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রটির যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা সংস্কার করে দেওয়া হবে।
গত শনিবার সেন্টারটির সামনে সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ভাঙা স্থাপনার কারণে সেন্টারটির ফটকের বাইরে টেবিল-চেয়ার পেতে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের টিকা দেন। গতকাল রোববারও একইভাবে সড়কের পাশে ত্রিপলের নিচে সেবা দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হামলা হয়। ২০০ থেকে ২৫০ জন বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। সেখানকার দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট কর হয়। এক্সক্যাভেটর বা ভেকু দিয়ে একটি পাকা, তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়। মামলায় বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দেশব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষকে মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। শিশুদের টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি।
এখন সেই সেন্টারের ভাঙা কক্ষেই চলছে শিশুদের টিকাদান। পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।