গ্রেপ্তারের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া জামিন বাতিল, আদালত বললেন ‘অন্যায্য’

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার দুই ‘মাদক পাচারকারীর’ জামিন বাতিল করেছেন আদালত। গ্রেপ্তারের ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তাঁরা জামিন পেয়েছিলেন। আদালত বলেছেন, জামিনের আদেশটি ছিল ‘অন্যায্য ও বেআইনি’।

আজ রোববার ওই দুই আসামির জামিন বাতিল করার আদেশ দেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন।

এ সময় আদালত বলেন, আসামি তরিকুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়াকে জামিন দেওয়ার আদেশটি ছিল তড়িঘড়ি করে দেওয়া, পক্ষপাতমূলক ও অন্যায্য। মামলার গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনায় স্পষ্ট হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট ভুলভাবে জামিনের আদেশ দিয়েছেন। এ কারণে সেটি বাতিল করা প্রয়োজন।

আদালত আরও বলেন, আসামি তরিকুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়াকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলো। তাঁরা আত্মসমর্পণ না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অধিদপ্তরের একটি দলের সদস্যরা গত সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর গুলশানের মাদানী অ্যাভিনিউ থেকে তরিকুল ইসলাম (৩৭) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেন। কর্মকর্তারা বলছেন, তরিকুল আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের সদস্য। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিনই সকাল ১০টার দিকে অভিযান চালানো হয় তাঁর গ্রিন রোডের কার্যালয়ে। অভিযানকারী দলের সদস্যরা গেলে কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত উজ্জ্বল মিয়া (৩৫) নামের এক ব্যক্তি দরজা খুলে দেন। পরে সেখান থেকে প্রায় দেড় লাখ ট্রামাডল বড়ি উদ্ধার করা হয়।

ট্রামাডল একটি অপ্রচলিত মাদক। এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির কাছে এ ধরনের মাদক পাওয়া গেলে পরিমাণভেদে ১ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মাদক উদ্ধারের ঘটনায় গত মঙ্গলবার কলাবাগান থানায় মামলা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তরিকুল এসব মাদক বিদেশে পাচার করেন। তাঁর কাছ থেকে বিদেশে ওষুধ পাঠানোর ৩৫টি ইনভয়েস (চালান) পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, তরিকুল নিজেই ট্রামাডল বিদেশে নিয়ে যেতেন। এ জন্য ভিসা করাতে তিনি একটি দেশের দূতাবাসে গিয়েছিলেন। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোয়েন্দা তথ্য পায়। পরে তরিকুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থার গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সম্পর্ক রয়েছে।

তরিকুল ও উজ্জ্বলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদনসহ গত মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাড়ে তিনটার দিকে রিমান্ডের শুনানি শুরু হয়। বিকেল চারটার দিকে জামিনে বেরিয়ে যান আসামিরা।

বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে গ্রেপ্তার আসামি এত দ্রুত কীভাবে জামিন পেলেন, তা নিয়ে অধিদপ্তরে প্রশ্ন দেখা দেয়। মামলার কোনো দুর্বলতা ছিল কি না, সেটা নিয়ে পর্যালোচনা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঘটনাটি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোয় ‘গ্রিন রোডে দেড় লাখ ট্রামাডল বড়িসহ গ্রেপ্তার, ৩১ ঘণ্টার মধ্যে হলো জামিন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস) মো. বশির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলা ও জব্দ তালিকা করা হয়েছে। জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, তরিকুলের পরিবারের একজন সদস্য জামিনের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি বিচার বিভাগে কর্মরত। বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে তরিকুলের মুঠোফোনে ফোন করা হয়, খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।  

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মাদক উদ্ধারের পর তা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। তরিকুলের কার্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া বড়ি আসলে মাদক কি না, সেটা নিশ্চিত হতে রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আইনজীবী নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বড়িগুলো মাদক কি না, নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের জামিন দিয়েছেন আদালত। রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে সেগুলো মাদক, তাহলে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তরিকুল ও উজ্জ্বল ভারতের গুজরাট ও ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছের ওষুধের দোকান থেকে ট্রামাডল সংগ্রহ করতেন। পরে তা কয়েকটি দেশে পাচার করতেন বরে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, তরিকুল ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক বিক্রির টাকা লেনদেন করেন।

ঘটনাটির প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার করা বস্তু মাদক হয়ে থাকলে জামিনের সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনায় জামিন সাধারণত নিম্ন আদালতে দেওয়া হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত জামিন দিয়ে থাকেন, তা-ও অনেক সময় পর।

আরও পড়ুন