এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসা বলছে, সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগ তাদের মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অন্যদিকে, ডিএনসিসি বলছে, ঢাকা ওয়াসার অপেক্ষায় থাকলে বহু বছরেও রাজধানীতে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

স্যানিটেশন ও নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৫০ বছরেও ঢাকায় কোনো কার্যকর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ঢাকার ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থাই নেই। যে ২০ শতাংশ এলাকায় নিষ্কাশনব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানকারও পয়োনালাগুলোর অধিকাংশ অকেজো। অধিকাংশ পয়োবর্জ্য কোনো না কোনো পথে খাল ও নদীতে যাচ্ছে।

২০১৪ সালে ঢাকা মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা তৈরি করে ঢাকা ওয়াসা। সে অনুসারে ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে উত্তরা, মিরপুর, রামপুরা (দাশেরকান্দি), রায়েরবাজার ও পাগলায় (দ্বিতীয়) পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। তবে গত ৯ বছরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ধীর। শোধনাগারগুলোর মধ্যে শুধু দাশেরকান্দির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, তবে পয়োবর্জ্য শোধনাগার পর্যন্ত পৌঁছানোর মতো নেটওয়ার্ক করা হয়নি।

রাজধানীর বিদ্যমান পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় বদল আনতে গত বছর থেকে কাজ শুরু করে ডিএনসিসি। রাজধানীবাসীর পয়োবর্জ্যের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব নিষ্কাশনের জন্য একটি পথনকশা প্রস্তুত করেছে সংস্থাটি, যেটির মূল উদ্দেশ্য বাসাবাড়িসহ যেখানে পয়োবর্জ্য উৎপন্ন (অনসাইট) হবে, সেখানেই সেপটিক ট্যাংকসহ পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।

ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের পয়োবর্জ্য নিয়ে তৈরি করা পথনকশাটিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজউকের সহায়তা নিয়ে রাজধানীর সব ধরনের অবকাঠামোর সেপটিক ট্যাংক–সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, পয়োবর্জ্যের পরিবেশবান্ধব নিষ্কাশন নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালের মধ্যে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রটোকল প্রস্তুত করবে ডিএনসিসি। ২০২৪ সাল এবং এর পরবর্তী সময়ের মধ্যে বৃষ্টির পানির নালায় এবং খাল, নদী ও লেকে পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন কমিয়ে আনা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য।

নিরাপদ পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলতি বছরের ১৪ মার্চ ঢাকা ডিএনসিসির নগরভবনে একটি কর্মশালা আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, ঢাকা ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক কার্যকর নয়। অথচ ওয়াসা পানির বিলের সমান পয়োনিষ্কাশন বিল আদায় করছে। জনগণ কেন এই টাকা দেবে?

রাজধানীর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও ইউনিসেফের স্যানিটেশন পরামর্শক মুজিবুর রহমান। গত বছর তাঁর একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, একজন ব্যক্তি দৈনিক ৯১ লিটার পয়োবর্জ্য নিঃসরণ করেন। ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন জনসংখ্যা ১ কোটি হিসাবে রাজধানীতে দৈনিক ৯১০ মিলিয়ন লিটার পয়োবর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং বাসাবাড়িতে সেপটিক ট্যাংক না থাকায় দৈনিক ৯০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সরাসরি মিঠাপানির উৎসে চলে যায়।

মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চায় ঢাকা ওয়াসা

জাতিসংঘের ঘোষণা করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৬ নম্বর অভীষ্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় ২০৩০ সালের মধ্যে রাজধানীবাসীর জন্য পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

তবে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের অপেক্ষা করতে করতে পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকাকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না। বিশ্বের অনেক দেশেই পয়োবর্জ্যের অনসাইট ব্যবস্থাপনা করে সুফল পাওয়া গেছে। জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের এই কার্যক্রমে যুক্ত করে ঢাকাকে রক্ষা করতে হবে।

সিটি করপোরেশনের এই অনসাইট পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাকে নিজেদের মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ওয়াসার আইন অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি পয়োবর্জ্য সংগ্রহ, পাম্পিং ও পরিশোধনের জন্য কোনো সুবিধাদি নির্মাণ বা সংরক্ষণ করতে পারবে না।

ওয়াসার চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও ওয়ার্কশপে প্রতিটি বাড়ির জন্য পৃথক পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে, যা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে বাস্তবসম্মত ও টেকসই হবে না। সব ক্ষেত্রে অনসাইট পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ওয়াসার মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ঢাকার পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তিমূলক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। এমন দ্বৈত পরিকল্পনায় জনগণের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, খালগুলো এখন সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে। এসব খালে পয়োবর্জ্য ফেলা যাবে না। পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পয়োবর্জ্যের কারণে। ওয়াসা যদি মনে করে, অনসাইট পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা তাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথা বলুক।

বাসাবাড়িতে অনসাইট পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাড়ির মালিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দুটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যেসব এলাকায় ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক রয়েছে, সেখানে ওয়াসা পয়োনিষ্কাশন বিল নেয়। সেখানকার কোনো বাসায় নিজস্ব পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা করলেও ওয়াসাকে বিল দিতে হবে কি না। আর ভবিষ্যতে ওয়াসার নেটওয়ার্ক চালু হলে অনসাইট ব্যবস্থাপনা থাকা বাড়ির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে।

ঢাকার মতো নগরীর জন্য অনসাইট পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা আদর্শ হতে পারে বলে মনে করেন নগর গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা শহরে পয়োবর্জ্যের নেটওয়ার্ক নতুন করে তৈরি করা অনেক কঠিন। বাসাবাড়িতে পয়োবর্জ্যের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সহজ। সরকারের এক সংস্থা বাসাবাড়িতে ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বলছে, অন্যদিকে ওয়াসা শোধনাগার নির্মাণ করছে। সরকারকে সবার আগে পয়োবর্জ্যের বিষয়ে নীতি (পলিসি) ঠিক করতে হবে।