নিহত চারজনের স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে আজ শাহবাগে মানববন্ধন করা হয়।

মানববন্ধনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, নিহত বিজ্ঞানীদের নামে কমিশনে একটি করে গবেষণাগারের নামকরণ, কমিশন প্রাঙ্গণে স্মারকস্তম্ভ নির্মাণ, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কমিশনের বাসটি সংরক্ষণ করা, নিরাপদ সড়ক আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ৩০টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার বাস্তবায়ন।

মানববন্ধনে পূজা সরকারের বাবা অমল সরকার বলেন, ‘আমি হতভাগ্য পিতা। কেননা, আমি তাঁকে জন্ম দিয়ে মানুষ করলেও তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারিনি। তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, যা সে বাস্তবায়ন করতে পারেনি।’

অমল সরকার আরও বলেন, দুর্ঘটনার দুই মাস হতে চলল। কিন্তু কমিশন এখনো অভিযুক্ত বাসের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেনি। হাইওয়ে পুলিশ মামলা করলেও বাসমালিকের বিরুদ্ধে কিছু করেনি। তাঁর সন্দেহ, বিচার হয়তো পাবেন না। সরকারের কাছে তাঁর দাবি, সড়কে যেন আর দুর্ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, যত দিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হবে, আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ না হবে, তত দিন পর্যন্ত ব্যত্যয়গুলো ঘটতে থাকবে। যে বিজ্ঞানীরা চলে গেলেন, তাতে একেকটি স্বপ্নের মৃত্যু হলো। স্বপ্নগুলোকে হত্যা করা হলো। এই হত্যাকাণ্ড প্রতিদিন ঘটছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় স্বপ্ন-সম্ভাবনার মৃত্যুতে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি মৃত্যুকূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে উদ্ধার পেতে চায় দেশ। একটা খুবই বেদনার ব্যাপার যে শাস্তি আমরা হতে দেখি না। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে সড়কে হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার করা হোক। অন্যথায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

মানববন্ধনে উত্থাপিত দাবিগুলোর সঙ্গে একাত্মতা জানান কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক। তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনায় এতজন মানুষ মারা গেছেন, এর তদন্ত-বিচার-আইনানুগ ব্যবস্থা-দোষীদের শাস্তি—এগুলো একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অথচ, এগুলো কেন দাবি করতে হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।

আনিসুল হক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। একটা সহজ বিষয় হলো, পুরো সেক্টরে অনিয়ম চলছে। পুরো সেক্টরই দুর্নীতিগ্রস্ত। লাইসেন্স আসলে কিছুই মিন করে না। চার-পাঁচ-ছয় হাজার টাকা দিয়ে একটা কাগজ কেনা হয়।

ফিটনেসের ক্ষেত্রেও একই কথা। এটা শুধু একটা কাগজ, যা পয়সার বিনিময়ে পাওয়া যায়। সড়কটা পুরো একটা মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। শুধু মৃত্যু নয়, অনেকে পঙ্গুও হয়। এটা জাতীয় জীবনের জন্য অনেক বড় একটা অর্থনৈতিক চাপও। এটাকে একটা সিস্টেমের মধ্যে আনতে হবে। এর জন্য সরকারকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়ে আসতে হবে।

নৈরাজ্য থেকে সড়ককে রক্ষার মধ্য দিয়ে অনেক প্রাণ বাঁচতে পারে বলে মন্তব্য করেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার। তিনি বলেন, সড়কে দুর্ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। যেসব আইন আছে, সেগুলো সবার জানা আছে কি না, বাসচালক-মালিকেরা আইন জানেন কি না, সেগুলো জানার জন্য কী করণীয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে অনেক বেশি কঠোর হতে হবে। বিআরটিএকে চোখ খুলতে হবে। সর্বোপরি সড়কে নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তবেই এগুলোর সমাধান হবে।

পিপলস ইউনিভার্সিটির উপাচার্য আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, সড়ক-সংক্রান্ত অনেক আইন-নিয়মনীতি থাকলেও তার প্রয়োগ হচ্ছে না। এ কারণে বারবার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারের কাছে একটাই আরজি, আর কাউকে যেন সড়কে মৃত্যুবরণ করতে না হয়। তার জন্য একটি যথাযথ আইন প্রণয়ন করে তার প্রয়োগ করা হোক।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ হাজারের কাছাকাছি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনারও সঠিক তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সড়ক দুর্ঘটনাকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে। দেশে আইনের শাসন যতক্ষণ সুপ্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সড়কে নৈরাজ্য থামানো যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনার নামে যে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, তা–ও থামবে না।

মানববন্ধনে পূজা সরকারের চাচা হরিপদ মজুমদার, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে, বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক, কৃষক লীগ নেতা মোশারফ হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন