ফারদিনের বাবা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে বলেছেন, ‘এটা আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি ধূমপান ছাড়তে পারিনি বলে সন্তানদের কাছে আমার ভালোবাসা বা গর্বের জায়গা বোধ হয় ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমার তিন সন্তান ধূমপান কেন, ধূমপানের (সিগারেট) ধোঁয়াটা পর্যন্ত নিতে পারে না। ফারদিন বুয়েট ক্যাম্পাসে ছিল, উদ্ভাস কোচিংয়ের শিক্ষক ছিল, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যেত—কেউ কি বলতে পারবে ফারদিন ধূমপান করেছে? সে ধূমপায়ী ছিল না। যে ধূমপান করে না, সে ফেনসিডিল আসক্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। একজন বিতার্কিক, যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় যাবে, সে কি ফেনসিডিলসেবী হবে? ফেনসিডিলসেবীদের যে অবস্থা থাকে, সেই অবস্থায় কি বিতর্কে অংশ নেওয়া যায়? এ ধরনের সংবাদ...তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত করা বা নৈতিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে একজন বিতার্কিকের পক্ষে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের মনোবল ভেঙে দেওয়া।’

‘চিকিৎসকদের কাছ থেকে জেনেছি, ফারদিনের বুকে ও মাথায় আঘাত করা হয়েছে। প্রায় ছয় ফুটের দেহটা...পা থেকে মাথা পর্যন্ত অন্য কোনো পয়েন্টে আঘাত থাকতে পারত। তা না হয়ে শুধু মাথা ও বুকে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছে। তার মুঠোফোন, ব্লুটুথ—সবই রেখে দেওয়া হয়েছে (লাশের সঙ্গেই ছিল)। তার মানে, টার্গেটটা ছিল ফারদিনের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক, যা চিন্তা করে। এটা যাঁরা করেছেন, তাঁরা হয়তো এটার (চিন্তা) পক্ষে ছিলেন না বা নিতে পারতেন না।’

বিচার পেতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই পেতে হবে, তাই তাদের ওপর আস্থা ছাড়তে চান না বলে জানান কাজী নূর উদ্দিন রানা। তিনি বলেন, ‘তদন্তের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি। আমার সন্তান কারও শত্রু ছিল না। নিজের পেশাগত জীবনে আমি কারও সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করিনি। এমন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করাটা সহজ বিষয় নয়।

তদন্তকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ওপর আমরা আস্থা রাখতে চাই। তারা সময় নিচ্ছে। তারা প্রকৃত খুনি বা অপরাধীকেই চিহ্নিত করবে বলে বিশ্বাস করি। আমাদের কাছ থেকে যতটুকু তথ্য নেওয়ার ছিল, তা তারা নিয়েছে। কিন্তু পরে কোনো আপডেট পাইনি। তবে একটা প্রশ্ন রাখতে চাই যে ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার পর ৬ নভেম্বর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও তার পরিপ্রেক্ষিতে কেন এত দেরি হলো? সন্তানের লাশ পাওয়া পর্যন্ত জিডি-পরবর্তী কার্যক্রমে আমরা সন্তুষ্ট নই।’

চিকিৎসকদের কাছ থেকে জেনেছি, ফারদিনের বুকে ও মাথায় আঘাত করা হয়েছে। প্রায় ছয় ফুটের দেহটা...পা থেকে মাথা পর্যন্ত অন্য কোনো পয়েন্টে আঘাত থাকতে পারত। তা না হয়ে শুধু মাথা ও বুকে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছে। তার মুঠোফোন, ব্লুটুথ—সবই রেখে দেওয়া হয়েছে (লাশের সঙ্গেই ছিল)। তার মানে, টার্গেটটা ছিল ফারদিনের হৃদয় এবং মস্তিষ্ক, যা চিন্তা করে। এটা যাঁরা করেছেন, তাঁরা হয়তো এটার (চিন্তা) পক্ষে ছিলেন না বা নিতে পারতেন না
ফারদিনের বাবা

ফারদিনের বাবা আরও বলেন, বুশরাকে তাঁরা ফারদিনের সবশেষ সঙ্গী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর তিন সন্তান ঘর থেকে মাকে যে পয়েন্টের কথা বলে যেতেন, সেই পয়েন্টের বাইরে কখনো, কোনো দিন যেতেন না। তিনি বলেন, ‘বুশরা নামের মেয়েটিকে আমরা কখনোই চিনতাম না৷ রামপুরার যে স্পটে বুশরা ও ফারদিনকে দেখা গেছে...৷ বিশ্বাসযোগ্য যে ক্লিপটা...উল্টো পথ দিয়ে রিকশাটি আসছিল, আমার ছেলেটা একটা মেয়ের পাশে বসা ছিল। তার (ফারদিন) হাত দুটি তার হাঁটুর ওপর। এভাবে কেউ কোনো নারীর পাশে বসে, তা আমি দেখিনি। আপনারা জানেন, রামপুরা থেকে চনপাড়া পর্যন্ত লাইন (রাস্তা) আছে। রামপুরার ওই এলাকা থেকে সেখানে যেতে আধা ঘণ্টাই যথেষ্ট।’

এর আগে শিক্ষার্থীদের পক্ষে মানববন্ধনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান বুয়েটের দুই ছাত্র। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপর তাঁরা আস্থাশীল। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে এই বাহিনী ফারদিন হত্যার তদন্ত চালিয়ে যাবে এবং দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘সত্যপ্রকাশে গণমাধ্যম বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কয়েক দিন ধরে কিছু জায়গায় (গণমাধ্যম) ফারদিনকে নিয়ে কিছু আপত্তিকর ও ভিত্তিহীন খবর প্রচারিত হয়েছে, যা আমাদের মর্মাহত ও হতাশ করেছে। আশা করব, গণমাধ্যমগুলো ভবিষ্যতে খবর প্রকাশে আরও সতর্ক হয়ে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করবে।’

হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত হত্যাকারীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ফারদিনের পরিবারের পাশে আছে এবং থাকবে বলেও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়।

৪ নভেম্বর ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ফারদিন নূরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গত বুধবার রাতে কাজী নূর উদ্দিন রাজধানীর রামপুরা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফারদিনের বন্ধু আয়াতুল্লাহ বুশরার নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁকে রামপুরার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখন পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। এ ঘটনার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তবে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেনি তারা।