করোনায় থেমেছিল পড়াশোনা, শামীম এখন পেশাদার কসাই

সহযোগীকে নিয়ে গরুর মাংস কাটায় ব্যস্ত শামীম মিয়া। মিরপুর-১২, ঢাকা, ২৮ মেছবি: প্রথম আলো

ঈদের দিন বেলা আড়াইটা। মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের একটি ভবনের সামনে তখনো কোরবানির ব্যস্ততা। মাঝারি আকারের একটি গরুর মাংস কাটায় ব্যস্ত তিনজন। তাঁদের নেতৃত্বে ২৩ বছর বয়সী শামীম মিয়া। কোরবানি দেওয়া গরুর সামনে হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে শামীম। মুখে ক্লান্তির ছাপ—তবু থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, এটি ছিল তাঁর দিনের পঞ্চম গরু কাটার কাজ।

করোনা মহামারির আগে শামীম ছিলেন স্কুলের ছাত্র। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপের সময় পরিবারের আর্থিক সংকট বাড়তে থাকলে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। পরে অটো পাসে মাধ্যমিক পাস করলেও আর স্কুলে ফেরা হয়নি। তাই নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা বলতে গিয়ে এখনো নবম শ্রেণির কথাই বলেন শামীম।

ভাসানটেক বস্তিতে পরিবার নিয়ে থাকেন শামীম। পড়াশোনা ছাড়ার পর জীবিকার তাগিদে ভাসানটেক বাজারের একটি গরুর মাংসের দোকানে সহকারীর কাজ শুরু করেন। ওই বাজারের ‘আল্লাহর দান গোশত বিতান’-এর প্রধান কসাই তাঁর মামা আবদুল কুদ্দুস। তাঁর কাছেই মূলত কসাইয়ের কাজ শেখা। কয়েক বছরের মধ্যেই এখন নিজেই চুক্তি নিয়ে গরু কাটার কাজ করেন শামীম।

ঈদের দিন সকাল থেকে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। মিরপুরে এই গরু কাটার আগে ঢাকা সেনানিবাস এলাকায় চারটি গরু ও তিনটি খাসি কাটার কাজ শেষ করেছেন। এর মধ্যে দুটি গরুর কাজ করেছেন মামার সঙ্গে, বাকি দুটি নিজেই চুক্তি নিয়ে।

একটি গরু কেটে কত আয় হয় জানতে চাইলে শামীম বলেন, ঈদের দিন সকালে রেট একটু বেশি থাকে। সকালে গরু কাটার জন্য হাজারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। অর্থাৎ এক লাখ টাকা দামের একটি গরু জবাই, চামড়া ছাড়ানো ও মাংস কাটার কাজ করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে দুপুরের পর রেট কমে যায়। তখন হাজারে ১০০ টাকা হিসাবে কাজ করতে হয়।

একটি গরুর কাজ শেষ করতে কত সময় লাগে—এমন প্রশ্নে শামীম বলেন, সকালে শরীরে শক্তি থাকে। তখন এক থেকে দেড় ঘণ্টায় একটা গরুর কাজ শেষ করা যায়। কিন্তু দুপুরের পর শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন দুই থেকে আড়াই ঘণ্টাও লাগে।

শামীম জানান, খাসির আকার অনুযায়ী প্রতিটি খাসি কাটার জন্য দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়। ঈদের দিন মোট কত আয় হবে, তা এখনো নিশ্চিত নন তিনি। কারণ, প্রথম দুটি গরুর কাজ করেছেন ‘উস্তাদের’ সঙ্গে। সেখান থেকে কত পাবেন, তা মামাই ঠিক করবেন। তবে নিজের চুক্তিতে করা দুটি গরুর কাজ থেকেই প্রায় ১৯ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। এই টাকার মধ্য থেকেই সঙ্গে থাকা দুই সহযোগীর পারিশ্রমিক দিতে হবে।

শামীমের সঙ্গে কাজ করা সোহাগ হোসেন পেশায় একজন পিকআপ ভ্যানের চালক। ঈদের দিন অতিরিক্ত আয়ের আশায় কসাইদের সঙ্গে মাংস কাটার কাজ করেন। তিনিও থাকেন ভাসানটেক বস্তিতে। সোহাগ বলেন, একটি গরুর মাংস কাটার কাজ করে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পাওয়া যায়, কোনো কোনো গরুতে ১ হাজার ২০০ টাকাও মেলে। গত বছর ঈদের দিন সাতটি গরুর কাজ করে প্রায় ৬ হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে পেয়েছিলেন কয়েক কেজি মাংস।

আরেক সহযোগী আল আমিনের পেশা গাড়িতে মালামাল ওঠানো-নামানো। সদরঘাট এলাকায় সপ্তাহজুড়ে কাজ করেন, ঈদের ছুটিতে এসেছেন পরিবারের কাছে। তিন বছর ধরে ঈদের সময় মাংস কাটার কাজ করছেন। গত কোরবানিতে সাড়ে চার হাজার টাকা আয় হয়েছিল তাঁর।