বেইলি রোডে আগুনের খবরে গ্রাহকদের ভেতরে রেখে বাইরে তালা দেওয়া হয়: সিআইডি
২০২৪ সালে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের আগুনে পুড়ে ৩ জন ও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে ৪৩ জন মারা গিয়েছিলেন।
আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ‘কাচ্চি ভাই’ নামের খাবারের দোকানের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে খাবারের বিল পরিশোধ না করে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারেন। আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন তলায় থাকা কিছু মানুষ ছুটে যান ছাদের দিকে। কিন্তু ভবনের আটতলা ও ছাদ মিলে অবৈধভাবে ‘ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্ট’ থাকায় সেখানে গিয়েও আশ্রয় নিতে পারেননি তাঁরা।
আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসারও প্রাণপণ চেষ্টা করেন অনেকে। কিন্তু সিঁড়িতে খাবারের দোকানের গ্যাস সিলিন্ডারসহ নানা জিনিসপত্র রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা ছিল। এসব ‘অব্যবস্থাপনার জালে’ আটকা পড়ে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের আগুনে সেদিন ৪৬ জন মারা গিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ভবনটিতে আগুন লাগে। আগুনে পুড়ে ৩ জন ও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে ৪৩ জন মারা যান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. শাহজালাল মুন্সি গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত শেষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলা হয়। পরে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। প্রায় দুই বছর তদন্ত শেষে গত মঙ্গলবার ভবনের মালিকপক্ষ আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রমজানুল হক নিহাদসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি। বাকিরা হলেন আনোয়ারুল হক (২৯), মুন্সি হামিদুল আলম বিপুল (৪০), মো. সোহেল সিরাজ (৩৪), ইকবাল হোসেন কাউসার (৫০), জেইন উদ্দিন জিসান (২৯), মোহর আলী পলাশ (৫০), মো. ফরহাদ নাসিম আলীম (৫৫), আবদুল্লাহ আল মতিন (৩৫), মো. নজরুল ইসলাম খান (৫০), লতিফুর নেহাব (৬৫), খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ (৫৫), অঞ্জন কুমার সাহা (৫৫), মো. মুসফিকুর রহমান (৩১), জগলুল হাসান (৬৫), আশিকুর রহমান (৩৫), হোসাইন মোহাম্মদ তারেক (৪১), রাসেল আহম্মেদ (৩২), মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ (৩২), রাফি উজ-জাহেদ (৩৪), আদিব আলম (৩৯) ও শাহ ফয়সাল নাবিদ (৩৪)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. শাহজালাল মুন্সি গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত শেষে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
পুরো ভবনে কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। ছাদ খোলা না রেখে অবৈধভাবে ৮ তলা ও ছাদ মিলে ‘ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্ট’ করা হয়েছিল। ছাদে ওঠার গেটও বন্ধ করে রাখা হতো। এসব অব্যবস্থাপনার কারণেই সেদিন এত মানুষ মারা যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভবনের নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত নানা ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা পাওয়া গেছে। ভবনটির পাঁচতলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি ছিল। কিন্তু নিয়মবর্হিভূতভাবে ৮ তলা পর্যন্তই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে আসছিল মালিকপক্ষ। ভবনে থাকা ১০টি খাবারের দোকানের কোনোটির বৈধ কাগজপত্র ছিল না। দোকানগুলোর ভেতরের সজ্জায় বোর্ড ব্যবহার করা হয়েছিল; এতে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। ছাদেও ছিল অবৈধ স্থাপনা। পুরো ভবনে কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা ছিল না। ছাদ খোলা না রেখে অবৈধভাবে ৮ তলা ও ছাদ মিলে ‘ডুপ্লেক্স রেস্টুরেন্ট’ করা হয়েছিল। ছাদে ওঠার গেটও বন্ধ করে রাখা হতো। এসব অব্যবস্থাপনার কারণেই সেদিন এত মানুষ মারা যায়।
মো. ফয়সাল করিম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের গাফিলতির কারণে এত মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির একটি সূত্র বলছে, আগুনের সূত্রপাত ঘটে ভবনের নিচতলার ‘চুমুক’ নামের একটি কফি শপ থেকে। বৈদ্যুতিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ঘটনার দিন ২৯ ফেব্রুয়ারি ‘লিপ ইয়ার’ উপলক্ষে দ্বিতীয় তলায় থাকা ‘কাচ্চি ভাই’ নামের খাবারের দোকানে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে ওই দিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গ্রাহক ছিল। আগুনের খবর পেয়ে ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেন দোকানের ব্যবস্থাপক জেইন উদ্দিন জিসান, যাতে বিল পরিশোধ না করে কেউ বেরিয়ে যেতে না পারেন। এতে ওই খাবারের দোকানে আটকা পড়েন অনেকে। সেখানে শ্বাসরোধ হয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দোকানের ব্যবস্থাপক জেইন উদ্দিন জিসানের নির্দেশে দোকানের ফটকে তালা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর খামখেয়ালিপনার জন্য অনেকে মারা গেছেন। সে জন্য তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার দিন কেনাকাটা করতে গিয়ে ভবনের ভেতর আটকা পড়েছিলেন কেরানীগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. ফয়সাল করিম। আহত হয়ে প্রায় এক সপ্তাহ জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। মো. ফয়সাল করিম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের গাফিলতির কারণে এত মানুষ মারা গেছেন, তাঁদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।