তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীর স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্বালন, ১৫ বছরেও শেষ হয়নি ক্ষতিপূরণের লড়াই
সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীর নিহত হওয়ার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের পরিবারের ক্ষতিপূরণের আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। এক মামলায় হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণের আদেশ দিলেও তা আপিল বিভাগে বিচারাধীন; অন্য মামলাটি এখনো হাইকোর্টে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি–সংলগ্ন তারেক মাসুদ-মিশুক মুনীর স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁদের স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের কর্মী, আইনজীবী ও ব্লাস্টের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন।
মোমবাতি প্রজ্বালন শেষে মিশুক মুনীরের ভাই আসিফ মুনীর বলেন, প্রিয়জন হারানো পরিবারের জন্য এমন একটি দিন নিয়ে কথা বলা এখনো কঠিন। বড় কোনো দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের পর তৈরি হওয়া মানসিক আঘাত ১৫ বছর পরও শেষ হয়ে যায় না। শোক সব সময় দৃশ্যমান না হলেও তা থেকে যায়।
বার্ষিক স্মরণ আয়োজন অব্যাহত রাখায় ব্লাস্ট ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আসিফ মুনীর বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ পরিবারের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ বিদেশে থাকলেও আত্মিকভাবে তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আসিফ মুনীর বলেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চাওয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ নয়; তারা মর্যাদা ও সামাজিক স্বীকৃতিও চান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) পক্ষ থেকে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণকে কোনো ‘অনুদান’ বা ‘আর্থিক সহায়তা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ভুক্তভোগীদের আইনগত অধিকার।
সংগঠনটি সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ, দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব করার দাবি জানায় ব্লাস্ট। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
ব্লাস্টের তথ্যানুযায়ী, তারেক মাসুদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ মামলায় ২০১৭ সালে হাইকোর্ট ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন। তবে সেই মামলা এখনো আপিল বিভাগে বিচারাধীন। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের করা পৃথক ক্ষতিপূরণ মামলা হাইকোর্টে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য উল্লেখ করে ব্লাস্ট জানায়, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ৩০৭ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির মতে, এসব দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
স্মরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার স্মৃতিস্তম্ভে মোমবাতি প্রজ্বালনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ তারেক মাসুদের নির্মিত ‘মুক্তির গান’ ও ‘ফেরা’ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে। প্রতিবছরই এই স্থানে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরকে স্মরণ করে।