দুই ঘণ্টা গান গেয়েও এতটুকু ক্লান্ত হয়নি ছোট্ট অভ্র কুন্ডু। সে সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান সুরের ধারার শিশু বিভাগে প্রারম্ভিক শাখার ছাত্র। এক বছর ধরে ও গান শিখছে। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষে অভ্রর মা ছেলেকে টেনে নিয়ে এলেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কাছে। বললেন, ‘দিদি, আমার ছেলের জন্য আশীর্বাদ করবেন।’

রঙিন পাঞ্জাবি গায়ে অভ্র তখন অন্ধকারের ভেতর মাঠের দীর্ঘ মেহগনিগাছগুলোর পাতা গুনতে চেষ্টা করছে। তার মন একেবারে নেই বড়দের কথায়। এতক্ষণ অভ্রর মতো অনেকগুলো শিশু দুলে দুলে গান গেয়ে উদ্‌যাপন করেছে বসন্ত উৎসব। এবার তারা ছড়িয়ে গেল মাঠজুড়ে। যেন বসন্তের দোল উৎসব শুরু হলো তখন।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় সংগীতে–নৃত্যে ‘সুরের ধারা’ উদ্‌যাপন করল বসন্ত উৎসব। রাজধানীর লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত উৎসবে এসেছিলেন অনেক মানুষ। সন্ধ্যার আলো সঙ্গী করে শিল্পীদের কণ্ঠে প্রথম আহ্বান এল গৃহবাসীর জন্য। তাঁরা গাইলেন, ‘স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল/ দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল।’ লাল মাদুরে বসে থাকা খুদে সংগীতশিল্পীরাও গলা ছেড়ে আহ্বান জানাল যেন পুরো পৃথিবীকে। পেছনের মঞ্চে উপস্থিত তখন অভিজ্ঞ শিল্পীরা। খোলা হাওয়ায় দুলে উঠল তখন মাঠের প্রান্ত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সব গাছের পাতা। প্রকৃতি সংগীত থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই হয়তো পরের গানটিই ছিল ‘ও আমার চাঁদের আলো, আজ ফাগুনে সন্ধ্যাকালে/ ধরা দিয়েছ যে আমার পাতায় পাতায় ডালে ডালে।’ দাদরা তালের এই গান ঠিক ১০০ বছর আগে ১৯২৩ সালে শান্তিনিকেতনে বসে রচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতন প্রসঙ্গ আসায় বসন্ত উৎসব আর দোল পূর্ণিমার কথা আসে। ৮ মার্চ মাত্র তিন দিন আগে হয়ে গেল দোল পূর্ণিমা।

সুরের ধারার কর্ণধার রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বললেন, ‘শান্তিনিকেতনের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক আছে। সেখানে বসন্ত উৎসব পয়লা ফাল্গুনে নয়, হয় দোল পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে। সামনে রমজান শুরু হবে, আমরাও সবকিছু বিবেচনা করে তাই আজ করলাম বসন্ত উৎসব।’

সমবেত আর একক ২২টি সংগীত পরিবেশনা হলো আয়োজনে। ‘তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’ এবং ‘এবেলা ডাক পড়েছে কোন্‌খানে/ ফাগুনের ক্লান্ত ক্ষণের শেষ গানে।’—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতিধর্মী এমন অনেকগুলো গান ছিল সমবেত পরিবেশনায়। এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে, আনন্দবসন্তসমাগমের মতো পূজা পর্বের গান অথবা ‘আমার মল্লিকা বনে যখন প্রথম ধরেছে কলি’র মতো প্রকৃতি পর্বের গান ছিল একক পরিবেশনায়।

কয়েকটি গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করলেন সুরের ধারার শিক্ষার্থীরা। ‘নব শ্যামল শোভন রথে এসো বকুল–বিছানো পথে’ গানের সুরে সুরে নৃত্যের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হলো বসন্ত আহ্বানের আমন্ত্রণ। বাহার–কীর্তন রাগের এ গান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন ১৯১০ সালে। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা গাইলেন, ‘আকাশ আমায় ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে’ অথবা ‘তুমি একটু কেবল বসতে দিয়ো কাছে’র মতো কয়েকটি গান। এককভাবে গান গাইলেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী, সাজেদ আকবর, সালমা আকবরসহ কয়েকজন। কবিতা পড়ে শোনালেন নায়লা তারান্নুম।

প্রায় দুই শ শিক্ষার্থীর পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত বসন্ত উৎসবের এ বিশাল আয়োজন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে সুরের ধারার শিক্ষক স্বাতী সরকার বললেন প্রস্তুতির কথা। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, ‘১৫ দিন ধরে প্রতিদিন বিকেলে অনুশীলন হয়েছে। আমাদের শিশুরা খুব আনন্দ নিয়ে এ অনুশীলন করে। ওদের মধ্যে আগ্রহ থাকে শ্রোতাদের নিজের গান শোনানোর। আজকের আয়োজনে সাধারণ বর্ষের প্রায় ৫০ জন আর শিশু বিভাগের ১২০ জন শিল্পী অংশ নিয়েছে।’ গান শুনতে শুনতে এবারের বসন্ত উৎসব বিশেষ বলে মন্তব্য করলেন সুরের ধারার প্রাক্তন ছাত্রী শিল্পী গোমেজ। কেন বিশেষ জানতে চাইলে বললেন, করোনার জন্য গত কয়েক বছর এ আয়োজনটি হয়নি। এত দিন পর গানের সুরে সুরে বসন্তকে বরণ করছে কতজন শিল্পী! বিশেষ তো বটেই।

আইএফআইসি ব্যাংকের সহযোগিতায় আয়োজিত বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে চ্যানেল আইয়ে। সংগীত আয়োজন সঞ্চালনার সময় সঞ্চালক বলছিলেন, ‘প্রকৃতি যেমন বসন্তকে বরণ করে নেয়, তেমনি আমরাও বরণ করি।’

বসন্ত উৎসব নিয়ে জানতে চাইলে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বললেন, ‘মানুষের মনেরও তো ছুটি দরকার হয়। বসন্ত উৎসব ঘিরে মানুষের মন রঙে, রসে প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায়। তাই এ আয়োজন আমাদের মনের আনন্দের জন্য।’

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গান শেষ হলে শুরু হয় সমবেত নৃত্য। দর্শক–শ্রোতা সারির কেউ কেউ ভাবলেন এ হয়তো আজকের উৎসবের শেষ পরিবেশনা। কিন্তু সুরের ধারার সদস্যদের হাতে তখন রং আর ফুলের পাপড়ি অপেক্ষা করছে। সবশেষে সংগীত ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে’ গানের সুরে সুরে পা মেলাতে মেলাতে নৃত্যশিল্পীরা ছড়িয়ে দিলেন সেই রং আর ফুলের ছটা। সুরে শব্দে রঙে বসন্তের আলপনা আঁকা হলো রাতের মাঠে।