রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা: সমমনা দোকানদার সমিতির অধিকাংশ নেতা ব্যবসায়ী নন
মিরপুর ১ নম্বর–সংলগ্ন ফুটপাতে একসময় ব্যবসা করতেন মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ। তখন সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য হয়েছিলেন তিনি। ১৫ বছর আগে ব্যবসা ছাড়লেও তিনি এখনো এই সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, অনেক আগে এই সমিতির সদস্য হয়েছিলেন তিনি, এখন আর সক্রিয় সদস্য নন। বয়স ৭০ বছরের বেশি, স্বাভাবিক চলাফেরাও তেমন করতে পারেন না। সমিতির সভায়ও যেতে পারেন না। সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক তাঁর নাম ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যুক্ত করেছেন বলে জানান মফিজ উদ্দিন।
গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার (মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র) গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামটি আলোচনায় আসে। কয়েক ঘণ্টা ধরে দুই থেকে আড়াই শ দুর্বৃত্ত ভাঙচুর, লুটপাটের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ সমিতির সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয়। আর সমিতির কার্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করা হয় মিরপুর ১ নম্বর–সংলগ্ন বৈশাখী সুপারমার্কেট। এ ঘটনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় থাকা ৯ জনের মধ্যে ৪ জনই দোকানদার নন। এমনকি তাঁরা কোনো ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত নন।
মিরপুরের মেট্রোপলিটন থানা সমবায় সমিতি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সমমনা সমিতি নিবন্ধন পায় ১৯৯২ সালের ৪ মে। নিবন্ধন নম্বর ৩৫। পরে ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল সমিতির শেয়ার, কর্ম এলাকা পরিবর্তনসহ কিছু কারণে নিবন্ধন সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৯ সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়। সমিতির মোট সদস্য ৮৫।
সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় মিজানুর রহমান হাজরা সভাপতি, কাজী মকবুল হোসেন সহসভাপতি, মো. শাহ আলম গাজী সম্পাদক ও কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে কোষাধ্যক্ষ উল্লেখ করা হয়েছে। আর মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, মোহাম্মদ ছাকাওয়াত উল্ল্যাহ, আল আমিন, কবির হোসেন গাজী ও বকর ছিদ্দিক নামের পাঁচজনকে সদস্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকায় থাকা ৯ জনের মধ্যে ৪ জনই দোকানদার নন। এমনকি তাঁরা কোনো ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত নন। ব্যবসায়ী হিসেবে একজনের দোকানের ঠিকানা থাকলেও সেখানে গিয়ে তাঁর নামে কোনো দোকান পাওয়া যায়নি। অন্য দুজনের ব্যবসা বা দোকানের তথ্যও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাকি তিনজনের ঠিকানায় দোকান থাকলেও তাঁরা সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন।
এ বিষয়ে মিরপুরের মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কর্মকর্তা মুহাম্মদ ফিরোজুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, দোকানদার সমবায় সমিতির নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী সব সদস্যের দোকান থাকতে হবে। নিবন্ধনের আবেদনের সময় এসব বিষয় যাচাই করা হয়। পরে আর সেভাবে খোঁজ নেওয়া হয় না। তবে অডিটের সময় দেখা যায়, কেউ কেউ পরে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে আবার তথ্য গোপন করে সদস্য হিসেবে যুক্ত থাকেন।
সমমনা দোকানদার সমিতি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া, মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা সমিতির সাধারণ সদস্য। ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও তাঁরাই মূলত সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি বেশ পুরোনো
শাহ স্মৃতি মার্কেট ও আশপাশের বিভিন্ন মার্কেট কমিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব ব্যক্তি সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দায়িত্ব পান। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর সমিতির নতুন কোনো ব্যবস্থাপনা কমিটি হয়নি।
সমমনা দোকানদার সমিতি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া, মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা সমিতির সাধারণ সদস্য। ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও তাঁরাই মূলত সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁরা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালীন এই সমিতির সভাপতিও ছিলেন। তবে এখন আর সমিতির সঙ্গে যুক্ত নন বলে একাধিকবার তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেছেন।
বেশির ভাগই ব্যবসায়ী নন
সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর ১-এর শাহ স্মৃতি মার্কেটে ১১৩ নম্বর দোকানটি সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমানের এবং একই মার্কেটের ১১৪ নম্বর দোকানটি সম্পাদক শাহ আলম গাজীর। মার্কেটটি গুঁড়িয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ঠিক উল্টো পাশে।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিজানুর রহমানের দোকানে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। পাশের ১১৪ নম্বর দোকানে একজন বিক্রয়কর্মীকে পাওয়া যায়। তিনি দোকানে নতুন এসেছেন দাবি করে বলেন, মিজানুর রহমান ও শাহ আলম গাজী সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। এ সময় আশপাশের অন্য দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে দোকান ফাঁকা রেখে সরে যান ওই বিক্রয়কর্মী।
এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর আবার সেখানে গেলে মিজানুর রহমানের নামে থাকা দোকানটিতে একজনকে পাওয়া যায়। তিনি জানান, দোকানটির মালিক মিজানুর রহমান নন। তবে পাশের ১১৪ নম্বর দোকানটির মালিক শাহ আলম গাজী। তাঁর ভাষ্য, শাহ আলম গাজী মিজানুর রহমানের মামা। তবে ওই মার্কেটে মিজানুর রহমানের অন্য একটি দোকানের (৯৬ নম্বর) সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে ‘মেসার্স পাবনা ট্রেডার্স’ নামে ব্যবসা করেন ভাড়াটে আবদুল্লাহ হাসান। মিজানুর রহমান মালিক হলেও সরাসরি তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানান হাসান। পরে আরও খোঁজ করে ওই মার্কেটে শাহ আলম গাজীর একটি দোকানের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে ২৫ নম্বরের এ দোকান ভাড়া দিয়েছেন তিনি। সেখানে রুবেল গাজী নামের এক ব্যক্তি মসলার ব্যবসা করেন।
সহসভাপতি কাজী মকবুল হোসেন। কমিটির তালিকায় তাঁর কোনো দোকানের ঠিকানা দেওয়া নেই। সেখানে থাকা তাঁর বাসার ঠিকানায় গিয়ে কথা হয় নিরাপত্তাকর্মী বকুল মিয়ার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কাজী মকবুল হোসেন ওই ভবনের ষষ্ঠ তলার ‘এ’ ফ্ল্যাটে থাকেন। এখন বাসায় নেই। মকবুল ব্যবসায়ী কি না, সে তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি নিরাপত্তাকর্মী।
কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেনের দোকানের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে নুরানী জামে মসজিদ মার্কেটে। ওই মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী ও দোকানির সঙ্গে কথা বললেও দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা তুরাগ সিটির বাসায় গেলে কথা হয় নিরাপত্তাকর্মী নুর হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওই ভবনে তিনি তিন মাস ধরে চাকরি করছেন। কামাল নামের কাউকে চেনেন না।
আর সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকা পাঁচ সদস্যের মধ্যে মফিজ উদ্দিন, ছাকাওয়াত উল্ল্যাহ, আল আমিন, বকর ছিদ্দিকের দোকান বা ব্যবসার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। ছাকাওয়াত কিছুদিন আগে মারা গেছেন, আইনজীবী ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
বকর ছিদ্দিকের দোকানের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে বৈশাখী সুপার মার্কেটের ৫৪ নম্বর দোকান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দোকানটি মূলত সাখাওয়াত হোসেন নামের এক ব্যক্তির। তিনি পারিবারিক সূত্রে দোকানটির মালিক। আকাশ নামের একজনের কাছে সেটি ভাড়া দিয়েছেন। বকর ছিদ্দিক নামের কাউকে তিনি চেনেন না বলে জানান ভাড়াটে আকাশ।
আরেক সদস্য আল আমিন এই সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি একজন সাধারণ সদস্য। মূলত তিনি একটি ট্রাভেল এজেন্সি (ভ্রমণে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান) চালান। কোনো দোকানদার নন। হামলা, ভাঙচুর, দখল, লুটপাটের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তবে কমিটির সদস্যদের মধ্যে শুধু কবির হোসেনের নামে দোকান পাওয়া গেছে বৈশাখী সুপার মার্কেটে।
মিজানুর, কাজী মকবুল ও কামাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া গেছে।
শাহ আলম গ্রেপ্তার, অন্যরা অধরা
আলোচিত এ ঘটনায় ৫ দিনে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজী রয়েছেন। এর বাইরে হামলার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘটনাস্থলে কারা এক্সক্যাভেটর এনেছিল এবং নেতৃত্বে কারা ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে। একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, আইনের আওতায় আনা হবে।