গানে গানে আলোর জয়বাণী

সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে গানে গানে সংহতি সমাবেশ ‘শোনাও আলোর জয়বাণী’ আয়োজন করে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ। গতকাল ধানমন্ডির ছায়ানট ভবন মিলনায়তনেছবি : প্রথম আলো

গানের সুর, কবিতার ছন্দ ও দৃপ্ত কথামালায় আবহমান বাংলার সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ জানানো হলো গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবন মিলনায়তনে। ‘শুনাও আলোর জয়বাণী’ নামে গানে-আবৃত্তিতে সংহতি প্রকাশের এই আয়োজন করে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখা।

আয়োজনের মূল সুর ছিল সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংস্কৃতির সম্মিলিত প্রতিরোধ। সে কারণে প্রচলিত অর্থে এই আয়োজন কোনো ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ নয়, ছিল দীপ্ত কণ্ঠে, স্পষ্টভাবে উচ্চারিত এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। সেখানে গান ও কবিতা হয়ে ওঠে অস্ত্র। আর সমবেত কণ্ঠ পরিণত হয় ঐক্যের প্রতীক।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সমবেত কণ্ঠে গীত হয় চিরকালের সাহস জাগানো গান ‘নাই নাই ভয়, নাই নাই ভয়’। দর্শকেরা কণ্ঠ মিলিয়েছেন গানের সঙ্গে। ভয়কে জয় করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর সংকল্পই যেন ছড়িয়ে গেল গানের সুর, বাজনার ঝংকারে।

গানের পরে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি, প্রাবন্ধিক মফিদুল হক বলেন, ‘আমরা এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি। বাঙালির চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে আলোর পথযাত্রী হয়ে এই ছায়ানট যাত্রা শুরু করেছিল। তারপর নানা ঘাত–প্রতিঘাত পেরিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সকল মানুষের মিলনের মধ্য দিয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণ ঘটিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা লক্ষ করলাম, এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করতে ছায়ানট ও উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে এবং মানুষের মুক্তির পক্ষে কথা বলা দেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্র প্রথম আলোডেইলি স্টার–এর কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

মফিদুল হকের বক্তব্যে উঠে আসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সত্য বলার অধিকার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা। তিনি বলেন, ‘হামলাকারী অন্ধকারের শক্তিকে স্পষ্ট বলতে চাই, আমরা কখনো হার মানি না। বহু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কৃতির চর্চা আমরা অব্যাহত রাখব।’

এরপর আবার সবাই মিলে ভয়হীন প্রত্যয়ের গান ‘আমি ভয় করবো না ভয় করবো না’। এরপরে সত্যের পথে দৃঢ় থাকার গান ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’। গানের পরে কবি শামসুর রাহমানের কবিতা ‘এখনো দাঁড়িয়ে আছি’ আবৃত্তি করলেন সৈয়দ ফয়সল আহমদ। পরের ছিল দেশের গান ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’। পরের গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘সংঘ শরণ তীর্থ যাত্রা।’ অনুষ্ঠানের সব কটি গানই ছিল সমবেত কণ্ঠে। রবীন্দ্র ও নজরুলসংগীতের সঙ্গে দেশপ্রেম ও বিভিন্ন জাগরণীমূলক গান দিয়ে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি কৃষ্টি হেফাজ সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবৃতি পাঠ করেন। তিনি বলেন, আজ এই অনুষ্ঠানে শিল্পীরা মঞ্চ থেকে নেমে সামনে বসে সংগীত পরিবেশন করছেন। শ্রোতারা তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। পুরো মিলনায়তনই মঞ্চে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প-সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চার ক্ষেত্রগুলো ও প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনায় আমরা বেদনাহত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ। এসব ঘটনা সমাজকে বিভাজিত করে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্ব ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রয়াসেরই অংশ। চট্টগ্রামে এসব হামলার প্রতিবাদে শৈল্পিক প্রতিবাদে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তিনি অবিলম্বে দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করেন।

পরের গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘এসো মুক্ত করো’,‘সেদিন আর কত দূরে’, ‘আমাদের নানান মতে নানান দলে’, ‘মানুষ হ, আবার তোরা মানুষ হ’, ‘হাতে মোদের কে দেবে’, ‘পথে এবার নামো সাথি’। গানের ফাঁকে আবৃত্তি করেন মাহমুদা আখতার ও জহিরুল হক খান। ধন্যবাদ জানান পরিষদের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক নীলাঞ্জনা চৌধুরী। শেষ হয় ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই চলবে’ এই সুরের প্রত্যয় জানিয়ে।