নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংগ্রহের আগ্রহ জাগাতে ‘হবি কার্নিভাল’
ছেলে শাহরিয়ার জারিফকে নিয়ে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে প্রদর্শনীতে এসেছেন শাহাদৎ হোসেন। তিনি ছেলেকে ২৫ পয়সার কয়েন চেনাচ্ছিলেন। তেজগাঁওয়ের গবর্নমেন্ট সায়েন্স হাইস্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিফ বলে উঠল, ‘আমি আজ লাল কয়েন দেখেছি, পুরোনো ঘড়ি দেখেছি।’
আজ শুক্রবার রাজধানীর পুরানা পল্টনের গ্রিন লাউঞ্জ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কনভেনশন সেন্টারে আয়োজন করা হয় ‘হবি কার্নিভাল-০২’। এই প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বাবা–ছেলে।
সকাল ১০টায় শুরু হয়ে এ আয়োজন চলে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। সংগ্রাহক মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম ব্যক্তি উদ্যোগে প্রদর্শনীটির আয়োজন করেন। এতে দেশের নানা প্রান্তের ২৫ জন সংগ্রাহক অংশ নেন।
প্রদর্শনীতে সংগ্রাহকেরা ধাতব মুদ্রা, টাকার নোট, ডাকটিকিট, ম্যাচ বক্স, টাইপ রাইটার, পত্রিকা, ক্যামেরা, কলম, ঘড়িসহ পুরোনো নানা জিনিসপত্র নিয়ে আসেন। নতুন প্রজন্মকে মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রেখে সৃজনশীল কাজে উদ্বুদ্ধ করা এই আয়োজনের উদ্দেশ্য বলে জানান আয়োজক।
প্রদর্শনী দেখতে এলেও নিজের ‘সংগ্রাহক’ পরিচয় দিতে ভোলেনি জারিফ। সে বলল, ‘আমি নিজেও কালেক্ট (সংগ্রহ) করি। আমাদের দেশের এক টাকা আছে, দুই টাকা আছে। আবার সৌদি আরবের পাঁচ রিয়েল আর দুইটা কয়েন আছে। লাল কয়েনও আছে একটা।’
প্রদর্শনীতে ডাক টিকিটের সংগ্রহ নিয়ে এসেছিলেন মোতাছিম বিল্লাহ। ১৫ বছর ধরে এই কাজে যুক্ত তিনি। দেশ অনুযায়ী ডাকটিকিটের সেট আছে তাঁর কাছে। এ ছাড়া আছে ব্রিটিশ আমলের সঞ্চয়পত্র (সেভিং সার্টিফিকেট)। এগুলো ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলেন তিনি।
ম্যাচ বক্সের সংগ্রহ নিয়ে এসেছিলেন আবিদ মল্লিক। বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভেনিজুয়েলা, মেক্সিকোসহ প্রায় ৫০ দেশের ম্যাচ বক্স তাঁর সংগ্রহে আছে বলে জানালেন। তবে চাহিদা বেশি বাংলাদেশি ম্যাচ বক্সের। এসব ম্যাচ বক্স বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকায়।
সংগ্রাহক শাহরিয়ার সাকিব এনেছিলেন পুরোনো পত্রিকার সংগ্রহ। আছে ১৫০টি দেশের ধাতব মুদ্রার সংগ্রহও। স্বাধীনতা–পরবর্তী টাকার নোটের সংগ্রহও আছে তাঁর। ১২ বছর বয়স থেকে সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। এখনো কাজের পাশাপাশি শখের বসে এই কাজটি করে চলেছেন।
‘রেয়ার অ্যান্ড কেয়ার’ নামে একটি স্টলে ছিল টাইপ রাইটার, পুরোনো পানের বাক্স, তালা, রেডিও, নব্বই ও ষাটের দশকের ক্যামেরাসহ নানা বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ।
প্রদর্শনী থেকে ম্যাচ বক্স কেনেন আল ইসলাম। জানালেন সংগ্রহ করবেন মুদ্রা ও মানচিত্র। আল ইসলাম বলেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, নব্বই দশক আর কী; সেই সময়কার ম্যাচ বক্স নিলাম। প্রজাপতি আর ডলফিন। এটা দেখলে ছোট বেলার কথা মনে পড়ে।’
প্রদর্শনীতে ছোটদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। অনেক অভিভাবক শিশুদের নিয়ে এসেছিলেন। গত মাসে এই প্রদর্শনীটি প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়। এবারের আয়োজনটি দ্বিতীয়। এখন থেকে প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে বলে আয়োজক কামরুল ইসলাম জানালেন।
কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনী হয়। কিন্তু আমাদের নতুন প্রজন্মের এই নিয়ে খুব বেশি ধারণা নেই। দেখা যায় সবাই মোবাইল বা গেমে আসক্ত। ওটা থেকে ফিরে এসে সৃজনশীল কিছুতে যেন তারা আগ্রহী হয়, এ জন্য এটা আয়োজন করা।’
ভবিষ্যতে স্কুলভিত্তিক ক্লাব করার পরিকল্পনা আছে বলেও জানালেন কামরুল ইসলাম। সেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সংগ্রহ প্রদর্শন ও বিনিময় করবে। কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, সন্তানদের সংগ্রাহক বানালে ওরা খারাপ পথে যাওয়া থেকে বিরত থাকবে।’