রাজধানীর খাল—২
খাল কোথাও নালা, কোথাও ভাগাড়
গত চার অর্থবছরে খাল খনন, রক্ষণাবেক্ষণ, সীমানাখুঁটি বসানো, বর্জ্য ও পলি অপসারণে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ব্যয় প্রায় ৭০ কোটি টাকা।
প্রতি বর্ষায় ভারী বৃষ্টি হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকার বেশ কিছু অংশে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর বড় কারণ হাজারীবাগ–জিগাতলা এলাকার পানিনিষ্কাশনের পথ কালুনগর খালের বেশির ভাগ অংশ ভরাট হয়ে যাওয়া। এ খাল দ্রুত সংস্কার করা না হলে আগামী বর্ষায় হাজারীবাগ–জিগাতলা এলাকায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়তে পারেন মানুষ।
কালুনগর খালের শুরু হাজারীবাগের শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয়ের পেছনের দিক থেকে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এই খাল সিকদার মেডিকেল কলেজের সামনের দিকে এসে নালায় রূপ নিয়েছে। সেই নালা কিছু দূর পর বুড়িগঙ্গা নদীতে মিশেছে। প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক ১ মার্চ কালুনগর খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেছেন। এ খাল প্রস্থে কোথাও ১৫ ফুট, আবার কোথাও ১৫০ ফুট।
কালুনগর খালের শুরুর দিকের (হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ এলাকায়) প্রায় ৩০০ মিটার অংশে আবর্জনা জমেছে। এখানে পানির প্রবাহ নেই। তবে কিছু দূর সামনে এগোলে দেখা যায়, খালের মধ্যে একটি সরু অংশ দিয়ে কালো পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
কালুনগর খালের মতো প্রায় একই অবস্থা খিলগাঁওয়ের জিরানি খালের। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। জিরানী খালের শুরুর দিকে প্রায় ২০০ মিটার অংশ আবর্জনা জমে ভরাট হয়ে গেছে। এরপর খালের কিছু অংশ পানির ক্ষীণ ধারা রয়েছে। এ খালের শুরু সবুজবাগের কুসুমবাগ ব্রিজের নিচ থেকে। প্রায় চার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে খালটি ত্রিমোহনী বাজার–সংলগ্ন বালু নদে মিশেছে।
এ খালের নন্দীপাড়া সেতু-সংলগ্ন এলাকায় আবর্জনার স্তর জমেছে। খালপাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, বছরখানেক আগে পরিস্থিতি ভালো ছিল। তখন খালের এই অংশে পানির প্রবাহ ছিল।
জিরানী খালের মতোই শ্যামপুর খালের কোথাও পানির প্রবাহ আছে, কোথাও শুকিয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শ্যামপুর খালের বড়ইতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ৩০০ মিটার অংশ প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।
বড়ইতলা এলাকায় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুজনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত দেড় বছরে খালের এই অংশে কোনো সংস্কার না হওয়ায় প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। এলাকায় মশার উৎপাতও বেড়ে গেছে। শ্যামপুর খালের দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। কাগজে-কলমে এ খালের প্রস্থ কোথাও ১৫ ফুট, কোথাও ৩৫ ফুট। পূর্ব জুরাইনের বড়ইতলা থেকে শুরু হয়ে এ খাল বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সিদ্ধিরগঞ্জের পাগলা খালে গিয়ে মিশেছে।
কালুনগর খালের শুরুর দিকের (হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ এলাকায়) প্রায় ৩০০ মিটার অংশে আবর্জনা জমেছে। এখানে পানির প্রবাহ নেই। তবে কিছু দূর সামনে এগোলে দেখা যায়, খালের মধ্যে একটি সরু অংশ দিয়ে কালো পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
দক্ষিণে ২৫ খাল
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে খাল আছে ২৫টি। খালগুলো হলো কালুনগর খাল, জিরানী খাল, মান্ডা খাল, শ্যামপুর খাল, কাজলা খাল, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডের পশ্চিমাংশের খাল, দক্ষিণ কুতুবখালী খাল, উত্তর কুতুবখালী খাল, বর্ণমালা খাল, ডগাইর খাল, সুকর্শি খাল, গলাকাটা ব্রিজ–স্টাফ কোয়ার্টার খাল, পাড়া ডগাইর খাল, কোনাপাড়া খাল, তিতাস খাল, মাতুয়াইল কবরস্থান–সংলগ্ন খাল, খিলগাঁও–বাসাবো খাল, মৃধাবাড়ি খাল, জিয়ার সরণি খাল, নাগদারপাড় খাল ও নড়াই খাল। এ ছাড়া চারটি খাল এখন বক্স কালভার্টে রূপ নিয়েছে। সেগুলো হলো ধোলাইখাল বক্স কালভার্ট, সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট, পান্থপথ বক্স কালভার্ট ও পরীবাগ বক্স কালভার্ট। এর মধ্যে কালুনগর, জিরানী, মান্ডা, শ্যামপুর ও খিলগাঁও-বাসাবো খাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ ঘুরে দেখেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। এর পাশাপাশি একটি চ্যানেলও (আদি বুড়িগঙ্গা) এই প্রতিবেদক ঘুরে দেখেছেন।
যে পাঁচ খাল সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে, তার প্রতিটিতেই আবর্জনা জমে কোনো না কোনো অংশ ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পানির প্রবাহ থাকলেও সংকুচিত হয়ে গেছে খাল।
খাল সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক বিএনপির নেতা মো. আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক জায়গায় খাল দখল ও ভরাটের ঘটনা রয়েছে। সেগুলো উদ্ধার ও সচল করার চেষ্টা চলছে। খালের সীমানা নির্ধারণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কম খরচে কীভাবে বেশি কাজ করা যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, গত কয়েক বছরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খালে খনন ও দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করা হয়েছিল। কোথাও বর্জ্য ও পলি অপসারণ, কোথাও সীমানাখুঁটি বসানোর কাজও হয়েছে। কিছু খালকে নান্দনিকভাবে সাজানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। ২০২১–২২ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে খাল খনন, রক্ষণাবেক্ষণ, সীমানাখুঁটি বসানো, বর্জ্য ও পলি অপসারণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।
অনেক জায়গায় খাল দখল ও ভরাটের ঘটনা রয়েছে। সেগুলো উদ্ধার ও সচল করার চেষ্টা চলছে। খালের সীমানা নির্ধারণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কম খরচে কীভাবে বেশি কাজ করা যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক বিএনপির নেতা মো. আবদুস সালাম
খাল সংস্কারের কাজটি করে সিটি করপোরেশনের পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, খাল নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য যে জনবল দরকার, তা আসলে সিটি করপোরেশনের নেই। আবার খাল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। দক্ষিণ সিটির প্রধান খালগুলো যাতে সারা বছর সচল থাকে, সেই চেষ্টা থাকে সিটি করপোরেশনের। তবে যতটা দরকার, তার পুরোটা করা সম্ভব হয় না, এটি অস্বীকার করে লাভ নেই।
আগের চেয়ে খারাপ অবস্থা
আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে ঘিরে হাতিরঝিলের চেয়েও বড় ও নান্দনিক এক প্রকল্প নিয়েছিল দক্ষিণ সিটি। সে জন্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকা খনন ও দখলমুক্ত করা হয়। কাজটি হয়েছিল ওই চ্যানেলের কামরাঙ্গীরচর ও লালবাগ এলাকার মাঝখানের অংশে। এর দুই বছর বছর পর ১ মার্চ সরেজমিনে দেখা যায়, সেই প্রকল্পের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট নেই।
কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যখন মাটি তুলেছিল, ভেবেছিলাম এবার বোধ হয় এলাকার চেহারা বদলাবে। কিন্তু এখন তো অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ।’ বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা এই আদি চ্যানেল একসময় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ছিল। এই চ্যানেল দিয়ে নৌযানে পণ্য পরিবহন করা হতো। তবে দখল ও দূষণের কারণে চ্যানেলে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৭ সালে চ্যানেলটি উদ্ধার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। তবে কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে।
আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের অবস্থান লালবাগের ইসলামবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার মধ্যে। এর সীমানা কামরাঙ্গীরচরের মুসলিমবাগ থেকে হাজারীবাগের রায়ের বাজার পর্যন্ত। প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলটি সচল থাকলে লালবাগ, হাজারীবাগ, ধানমন্ডি ও কামরাঙ্গীরচর এলাকার জলাবদ্ধতা কমে আসবে।
হাজারীবাগের রায়ের বাজার স্লুইসগেট এলাকায় ১ মার্চ গিয়ে দেখা যায়, চ্যানেলের একাংশ ভরাট করে ইট ও বালুর ব্যবসা চলছে। চ্যানেলের এই অংশে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে।
সিটি করপোরেশন যখন মাটি তুলেছিল, ভেবেছিলাম এবার বোধ হয় এলাকার চেহারা বদলাবে। কিন্তু এখন তো অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ।কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম
করণীয় কী
নগর–পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, খাল ও জলাশয় শুধু জলাবদ্ধতা কমানোর জন্য নয়, রাজধানীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য খাল পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিন সরিয়ে সেগুলোকে কার্যকর রাখা দরকার।
এ বিষয়ে নগর–পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় জলাবদ্ধতার মূল কারণ প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনব্যবস্থাকে ধ্বংস করে কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। শুধু খালের ময়লা পরিষ্কার করলেই হবে না; খালগুলোর যে প্রাকৃতিক প্রস্থ ও গভীরতা, তা পুনরুদ্ধার করতে হবে। স্বল্প মেয়াদে সমাধান হলো প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করা এবং বিদ্যমান ড্রেনেজ অবকাঠামোকে পরিষ্কার ও কার্যকর রাখা। (শেষ)