ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা এখন বিশ্বজুড়ে। সেই আবহে পুরান ঢাকার টিকাটুলীর একটি সরু গলিও যেন রূপ নিয়েছে ক্ষুদ্র এক ফুটবল–জগতে। দেয়ালজুড়ে বিশ্বকাপের তারকা ফুটবলারদের প্রতিকৃতি, মাথার ওপর বিভিন্ন দেশের পতাকা আর ঝলমলে আলোকসজ্জা। স্বামীবাগের কে এম দাস লেন এখন সবার কাছে পরিচিত ‘ফিফা গলি’ নামে।
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে সাজানো এই গলিতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার ফুটবলপ্রেমীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরে দেখছেন ফুটবল তারকাদের প্রতিকৃতি।
আজ শুক্রবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গলির প্রবেশমুখে রয়েছে ‘স্বামীবাগ ফিফা গলি’ নামে একটি তোরণ। গলির ভেতরে ফুটবল খেলছেন কয়েকজন তরুণ। দুই পাশের দেয়ালে আঁকা রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নানা সময়ের কিংবদন্তি ও জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের ছবি। গলির ওপরে টানানো হয়েছে বিভিন্ন দেশের পতাকার নকশা। মাটিতে বড় অক্ষরে লেখা, ‘ওয়েলকাম টু ফিফা গলি’।
দেয়ালজুড়ে ফুটবল তারকাদের মুখ
ফিফা গলির দেয়ালে স্থান পেয়েছেন ফুটবল–সম্রাট পেলে, আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি, ব্রাজিলের নেইমার, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের আলোচিত তরুণ স্প্যানিশ তারকা লামিনে ইয়ামাল। শুধু আন্তর্জাতিক তারকারাই নন, জায়গা পেয়েছেন বাংলাদেশের তারকা ফুটবলার হামজা চৌধুরী ও জামাল ভূঁইয়াও। রয়েছেন সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের একটি বিশেষ চিত্র।
একটি দেয়ালে আঁকা হয়েছে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির বার্তাও। সেখানে দেখা যায়, সাদা–কালো কেফিয়াহ দিয়ে মুখ ও মাথা ঢাকা এক ফুটবলারের ছবি, যিনি বল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনের পতাকা। বড় করে লেখা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বা ফিলিস্তিন মুক্ত করো। পাশে রয়েছে এক ফিলিস্তিনি তরুণীর ছবি, যার সামনে একটি ফুটবল ও দুই পাশে কয়েকজন শিশুর প্রতিকৃতি।
ছবি তুলতে ভিড় দর্শনার্থীদের
বরিশাল থেকে ঢাকায় একটি পরীক্ষা দিতে এসেছেন দীপন কুমার সরকার। স্বামীবাগে আত্মীয়ের বাসায় ওঠার পর ফিফা গলির কথা শুনে স্ত্রী রুম্পা রায় ও মেয়ে রাজশ্রী সর্দারকে নিয়ে দেখতে আসেন।
দীপন বলেন, ‘বিশ্বকাপ নিয়ে সবারই আগ্রহ অন্য রকম। পাশেই আত্মীয়ের বাসায় এসে এই গলির কথা শুনেছি। তাই স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে দেখতে চলে এলাম। দেখে ভালোই লাগছে। ফুটবল তারকাদের ছবিগুলো সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছে। তাই পরিবার নিয়ে কিছু ছবি তুললাম।’
কেরানীগঞ্জ থেকে ফিফা গলি দেখতে এসেছেন আবু বকর আদি। আর্জেন্টিনার সমর্থক এই দর্শনার্থী বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও দেখে জায়গাটির কথা জানতে পারি। তাই সরাসরি দেখতে এলাম। এখানে এসে ভালো লেগেছে। বিশ্বকাপের যে উন্মাদনা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তার একটা প্রতিফলন এই গলিতে দেখা যায়।’
যাত্রাবাড়ীর ওয়ার্ল্ড সাইন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক সাবিহা ফারহিন বিনা বলেন, ‘আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল সমর্থকদের নিয়ে অনেক সময় বিভিন্ন জায়গায় ঝগড়া বা মারামারির খবর শুনি। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, সব দলের খেলোয়াড়দের ছবি পাশাপাশি আঁকা হয়েছে। বিষয়টি ভালো লেগেছে। বিশেষ করে দেয়ালের চিত্রকর্মগুলো খুবই আকর্ষণীয়।’
যেভাবে নাম বদলে হলো ‘ফিফা গলি’
ফিফা গলির এই আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তাদের একজন সাজ্জাদ হোসাইন রাসেল। তিনি জানান, ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ থেকেই এই লেন সাজানোর উদ্যোগ শুরু হয়। তবে তখন সবাই অতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আরও কিছুটা বড় পরিসরে সাজানো হয়। তখন বিষয়টি আলোচনায় আসতে শুরু করে।
সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘২০১৮ সালের বিশ্বকাপ থেকে আমরা দেয়ালে ফুটবল–বিষয়ক চিত্রকর্ম আঁকা শুরু করি। তবে তখন এত বড় পরিসরে হয়নি, আলোচিতও হয়নি। তখন আমাদের কয়েকজন ছোট ভাই এই গলির নাম দেয় “ফিফা গলি”। এরপর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার পর থেকেই সবাই এই জায়গাটিকে ফিফা গলি নামে চিনতে শুরু করে।’
২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে এবারও আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানান সাজ্জাদ। বিশ্বকাপ শুরুর প্রায় এক মাস আগে দেয়ালে নতুন করে চিত্রকর্ম আঁকা ও আলোকসজ্জার কাজ শুরু হয় বলে জানান তিনি।
কোন শিল্পীরা এই দেয়ালচিত্র সাজালেন—এমন প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের স্থানীয় ছয় থেকে সাতজন ছোট ভাই ছবিগুলো এঁকেছেন। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়াশোনা করেন। দেয়ালচিত্র ও আলোকসজ্জার খরচ বহন করেছেন এলাকার ফুটবলপ্রেমীরাই।’
ফিফা গলি নামে গুগল ম্যাপে সার্চ দিলে পুরান ঢাকার এই ছোট্ট গলির চিত্র এখন ভেসে ওঠে। এটি এখন কেবল একটি ছোট্ট গলি নয়, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি বিশ্বকাপের আবেগ, উৎসব আর সম্প্রীতির প্রতীক।