শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে আবারও সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীরা, চার জেলায় বিক্ষোভ, অবরোধ
টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে গতকাল সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন।
শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল প্রশ্ন ও কঠিন প্রশ্ন করার অভিযোগও তুলেছেন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
বিকেল চারটার কিছু আগে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। সকালেও তাঁরা এখান থেকে অবরোধ শুরু করেন। এর আগে বেলা পৌনে তিনটার দিকে বকশীবাজারে ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সেখানে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং ‘ভুয়া’ ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরের সামনে যান শিক্ষার্থীরা। সেখানে পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকা বোর্ডের সামনে যান। সকালে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন।
শিক্ষার্থীরা উত্তরায় ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক, বরিশালে ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেছেন। ময়মনসিংহে ময়মনসিংহ–টাঙ্গাইল মহাসড়কও অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া কুমিল্লা, বগুড়া, ময়মনসিংহে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
আবারও সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ
সকালে যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, বিকেলে আবার সেখানেই ফিরে এসেছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিকেল পৌনে চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। সকালের মতো বিকেলেও মিরপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. সামির বলেন, কোথায় গিয়ে দাবি সঠিকভাবে তুলে ধরবেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। এ কারণে টিএসসিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন এই শিক্ষার্থী। দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
আগামীকাল বুধবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে আবারও সায়েন্স ল্যাবে এসে আন্দোলন করবেন বলে জানান ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী অপূর্ব ফিরোজ। দাবি না মানা পর্যন্ত সায়েন্স ল্যাবেই তাঁরা অবস্থান করবেন বলে জানান।
শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান, ইট ছোড়াছুড়ি
শিক্ষার্থীরা বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান করেন। তাঁরা সেখানে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট ছোড়েন। গেটে ধাক্কাধাক্কি করেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে অবস্থান করছেন।
ভিসি চত্বরের সামনে পুলিশের বাধা
সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় এক ঘণ্টা অবরোধ করেন। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত তাঁরা সেখানে অবস্থান করেন। দুপুরে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যান। ভিসি চত্বরের সামনে বেলা সোয়া একটার দিকে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত থেকে টিএসসিগামী সড়কে অবস্থান নেন।
উত্তরায় ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ
উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে অবরোধ করেছেন। উত্তরা ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবরোধ
বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে শিক্ষার্থীদের একদল ঢাকা কলেজের সামনে এবং আরেক দল টিএসসির দিকে যান। এক ঘণ্টা পর সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।
ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ, লালমাটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিএফ শাহীন কলেজসহ ১২ থেকে ১৫টি কলেজের শিক্ষার্থীরা এই অবরোধে অংশ নেন।
শিক্ষার্থীরা এ সময় ‘দফা এক দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’, ‘তুমি কে আমি কে, ফার্মের মুরগি’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’– এ রকম নানা স্লোগান দেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত বলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় আটটি প্রশ্নের মধ্যে দুটি প্রশ্নই ভুল করা হয়েছে। বাকি যে ছয়টি প্রশ্ন ছিল, সেই প্রশ্নগুলো অনেক বেশি কঠিন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মতো কঠিন প্রশ্ন করা হয়েছে। এখন আমি যদি ফেল করি, এর দায়ভার কি শিক্ষামন্ত্রী নেবেন? তিনি তো নেবেন না।’
ঢাকা আইডিয়াল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ মুনজি বলেন, 'বৈরী আবহাওয়ার ভেতরে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার কারণে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেননি। আবার অনেকে পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় রাস্তায় পড়ে গেছেন। অ্যাডমিট কার্ড ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এসবের দায় কি শিক্ষামন্ত্রী নেবেন?’
এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘যিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করতে পারেন না, আমরা এমন শিক্ষামন্ত্রী চাই না, তাঁর পদত্যাগ চাই।'
পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার রব্বানী হোসেন সকালে প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছেন। এখন সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
বগুড়ায় বিক্ষোভ–সমাবেশ
বৈরী আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষাসচিবের অপসারণের দাবিতে বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে তাঁরা মহানগরীর সাতমাথা এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। দুপুর ১২টার দিকে মিছিলটি নগরীর সাতমাথা এলাকা থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে যায়। কার্যালয় প্রাঙ্গণে সমাবেশ করা হয়। সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ না করলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুমকি দেন শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের সামনে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে নগরীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। অবরোধের ফলে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। বেলা দেড়টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলছিল।
কুমিল্লায় বিক্ষোভ
বেলা সোয়া ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে ‘কুমিল্লার সচেতন শিক্ষার্থীসমাজ’–এর ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
এ সময় তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে আমি কে, মুরগি মুরগি, কে বলেছে কে বলেছে, শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী’, ‘শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, মানতে হবে মানতে হবে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে কান্দিরপাড় থেকে মিছিল নিয়ে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড প্রাঙ্গণে গিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ করেন।
ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কে অবরোধ
ময়মনসিংহ নগরের টাউন হল এলাকায় ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা এই বিক্ষোভ করেন। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আসাদুজ্জামান শাকিল বলেন, যান চলাচলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।