সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রধর্ম বিল উত্থাপনের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সি আর দত্তের নেতৃত্বে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৮৮ সালের ২২ মে এই বিলের প্রতিবাদ জানিয়ে তৎকালীন স্পিকার শামসুল হুদা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছিল এ সংগঠন। এই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, সেই স্মারকলিপিতে বলা হয়েছিল, এ বিল পাস করা হলে বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্র থেকে কালক্রমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দেশ আজ ওই দিকেই ছুটছে।

এ অনুষ্ঠানে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ—এই দুই জেনারেল অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছেন। এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই করা হয়। বাহাত্তর সালের সংবিধানের কথা বলে যেতে হবে। বারবার বলতে হবে। এই আন্দোলন থেমে থাকার নয়। আন্দোলন ছাড়া কোনো কিছুই আমরা ফিরে পাব না।’

সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে একটি ধর্মকে সামনে এনে জাতিকে বিভাজিত করতে সংবিধানের মাথায় তুলে দেওয়া হয়েছিল ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। পঞ্চদশ সংশোধনীতে স্বাধীনতার পক্ষের দল সেটাকে আরও সুন্দর করে লেখল, ‘দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহের নামে’, তার সঙ্গে যোগ করল ‘পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে’। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হয়ে তারা জাতিকে কেন বিভাজন করল, এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘প্রতিটি মানুষ এ দেশের। তিনি সাক্ষর না নিরক্ষর, গ্রামে থাকেন না শহরে, হিন্দু না মুসলমান, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান, সমতলের নাকি পাহাড়ের অধিবাসী—এর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। এটিই আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। সেখানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কোনোভাবেই হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করা হচ্ছে। এর সুযোগ নিয়ে যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরাও ধর্মের সঙ্গে আপস করছেন।’

সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন থাকলেই যেখানে সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব, সেখানে এখনো কেন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম—সে প্রশ্ন রেখে নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, ‘“আদিবাসী” কথাটি বাহাত্তরের সংবিধানে উপেক্ষিত হয়েছিল। এটা নিয়ে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করার পর সেখানে “ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী” ব্যবহার করা হয়। সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের “আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে দাবি, তা গত ৫০ বছরে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল।’

ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, ‘সংবিধান আমরা ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছিলাম। কিন্তু সংবিধানের মূল যে স্পিরিট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সেটা নষ্ট করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য হৃদয়ের কান্নার, আকুতির ও হাহাকারের।’

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক। তিনি বলেন, সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ করতে এবং সেখানে ‘আদিবাসী’ শব্দ যোগ করার জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সামাজিক আন্দোলন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ প্রমুখ।