পোড়া ঘরের কয়লাই এখন আনোয়ারার আয়ের উৎস

গত ২৫ মে সন্ধ্যার ভয়াবহ আগুনে কালশী বস্তির শত শত ঘর পুড়ে গেছে। সেখানে এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ।

আগুনে পুড়ে গেছে বসতঘর। সেখানে তৈরি হওয়া কয়লা বিক্রির জন্য সংগ্রহ করছেন আনোয়ারা বেগম। গতকাল মিরপুরের কালশী বস্তিতেছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার বাউনিয়া বেড়িবাঁধসংলগ্ন কালশী বস্তি। ঈদের কয়েক দিন আগে, গত ২৫ মে সন্ধ্যায় লাগা ভয়াবহ আগুনে বস্তিটির শত শত ঘর পুড়ে গেছে। সেদিনের আগুনে পুড়েছে আনোয়ারা বেগমের থাকার ঘরটিও। গতকাল শনিবার দুপুরে বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, তপ্ত রোদের মধ্যে দুই শিশুকে সঙ্গে নিয়ে পোড়া ধ্বংসস্তূপের ভেতর কিছু খুঁজছেন তিনি। কাছে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পুড়ে যাওয়া কাঠের কয়লা সংগ্রহ করছেন আনোয়ারা।

দুই শিশুর একজন তাঁর নাতনি লামিয়া, অন্যজন নাতি ইব্রাহিম। লামিয়া ছেলের ঘরের সন্তান, আর ইব্রাহিম মেয়ে তানিয়া আক্তারের ছেলে। তানিয়া মায়ের সঙ্গে বস্তিতেই থাকেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায়। কথা বলে জানা যায়, আনোয়ারা ও তাঁর মেয়ে—দুজনেরই স্বামী তাঁদের ছেড়ে চলে গেছেন। সংসারের দায়িত্ব এখন মা-মেয়ের কাঁধেই।

আনোয়ারা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে লোহালক্কড়, পলিথিন-প্লাস্টিক কুড়িয়ে ভাঙারি দোকানে বিক্রি করেন। তা দিয়েই কোনোমতে চলে চারজনের সংসার। তবে কালশী বস্তির আগুন তাঁদের সামান্য সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে। পুড়ে গেছে থাকার ঘর। এখন বস্তির এক পাশে ত্রাণ হিসেবে পাওয়া ত্রিপল টাঙিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় গড়ে তুলেছেন তাঁরা।

আনোয়ারা জানান, যে জায়গা থেকে তিনি কয়লা কুড়িয়ে নিচ্ছেন, সেখানেই ছিল তাঁদের ঘর। আগুনে পুড়ে যাওয়া ওই ঘরের কাঠের কয়লাই এখন বিক্রির জন্য সংগ্রহ করছেন তিনি। ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া কয়লাই এখন তাঁদের আয়ের উৎস। সংসারের অভাব-অনটন আগেও ছিল, তবে আগুনে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন বলে জানালেন আনোয়ারা। তিনি বলেন, ‘ডাল-ভাত, আলুভর্তা খাইয়াই চলতাসি।’

এ বছর ঈদ তাঁদের জীবনে উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসেনি। আগুনে ঘর হারানোর শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই কেটেছে ঈদের দিন। আনোয়ারা বলেন, ‘ঈদের বেলা মাংস টুহাইতেও যাই নাই। গেলে হয়তো একটু মাংস পাইতাম। কিন্তু এই যে ঘরবাড়ি পুইড়া গেসে, এগুলা রাইখা কই যাইতাম?’

চুলায় আগুন ধরাইতে পারি নাই

কালশী বস্তির পোড়া ধ্বংসস্তূপে আনোয়ারা বেগমের মতো কয়লা সংগ্রহ করতে দেখা গেল নাসির মিয়াকেও। এক হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর ডান হাত প্রায় অচল। বাঁ হাত দিয়েই এত দিন গ্যাসের চুলা মেরামতের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী কাজ করেন ধাত্রী (দাই) হিসেবে।

বহু বছরের সঞ্চয় আর কয়েক দফা ঋণ নিয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে বস্তিতে সাত কক্ষের একটি ঘর তুলেছিলেন। এর মধ্যে দুটি কক্ষে নিজেরা থাকতেন, আর বাকি পাঁচটি কক্ষ দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়ায় দিয়েছিলেন। কিন্তু ২৫ মে সন্ধ্যার আগুনে তাঁদের নিজের থাকার ঘরসহ সব কটি কক্ষ পুড়ে গেছে। ভাড়াটেদের মতো তাঁরাও এখন গৃহহীন।

পুড়ে যাওয়া ঘরের জায়গায় বসে আছেন নাসির মিয়া। গতকাল কালশীতে
ছবি: প্রথম আলো

বর্তমানে রাস্তার পাশে ত্রাণ হিসেবে পাওয়া একটি ত্রিপল টাঙিয়ে তার নিচে একটি চৌকি পেতে কোনোমতে দিন কাটছে তাঁদের।

আগুনে ক্ষয়ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে নাসির জানান, এ ঘটনা তাঁর জীবনে নতুন নয়। ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বরও কালশী বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল। তখনো তাঁর ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরে কয়েক দফা ঋণ করে আবার ঘরগুলো নির্মাণ করেছিলেন। এবারও সেই ঘরগুলো আগুনে ধ্বংস হয়েছে।

কথা বলতে বলতে হাতে ধরা কয়লার টুকরাগুলোর দিকে তাকান তিনি। নাসির বলেন, ‘অনেকে দান-সাহায্য দিতাসে, ওইগুলা খাইয়া চলতাসি। এহনো নিজের চুলায় আগুন ধরাইতে পারি নাই।’

ছাই হয়ে গেছে দোকান

কালশী বস্তির আগুনে সর্বস্ব হারানো মানুষের তালিকায় আছেন নাজমা বেগমও। বস্তিতে তাঁর একটি ঘর ছিল, আর রাস্তার পাশেই ছিল ছোট্ট একটি দোকান। নাজমা বেগম বলেন, ‘দোকানে ফ্রিজ ছিল, চা-পান-সিগারেট ছিল, পানির বোতল ছিল। দোকানে ৫০ হাজার টাকার বেশি মালামাল ছিল। আগুনে দোকান ছাই হয়ে গেছে।’

এবারের ঈদ কষ্টের স্মৃতি হয়ে থাকবে জানিয়ে নাজমা বলেন, ‘ঈদ অনেক দুঃখের মধ্যে গেসে। সব পুইরা গেসে, কোনো সুখ ছিল না। নিজের পিন্দনের কাপড় নিয়া বাইর হইসি। আগের বছর তো বাড়িঘর ছিল, যা ছিল সব নিজের ছিল। আনন্দের ঈদ ছিল। এইবার আগুন ঈদের সব আনন্দ মাটি কইরা দিসে।’