ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকছে গ্যাসলাইনে, দুর্ভোগে ঢাকার কিছু এলাকাবাসী

জলাবদ্ধতার কারণে ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় তিতাসের পাইপলাইনে পানি ঢুকে গেছে। রান্নার চুলায় গ্যাস নেই অনেক স্থানে।

গ্যাসপ্রতীকী ছবি

সাড়ে তিন দশকের পুরোনো পাইপলাইন এখন জরাজীর্ণ। বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা কেটে অবকাঠামো উন্নয়নের সময় অনেক এলাকার পাইপে ছিদ্র হয়েছে। এতে গ্যাস অপচয়ের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন বিড়ম্বনা। এসব ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে যাচ্ছে পাইপলাইনে। এতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গ্যাসের সরবরাহ। এবারের জলাবদ্ধতায় ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের অভাবে ভুগছেন মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিং এলাকার খান মো. রবিউল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাইপে পানি ঢুকেছে। গ্যাস নেই। বাচ্চাদের নিয়ে খুব অসুবিধায় আছেন। টানা রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার দশা। বাধ্য হয়ে এখন বিদ্যুৎ-চালিত চুলা ব্যবহার করছেন।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, ঢাকার তিতাস, সিলেটের জালালাবাদ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বেশির ভাগ পাইপলাইনের বয়স ৩৫ বছরের বেশি। পুরোনো লাইন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই গ্যাস লিকেজ (পাইপলাইনে ছিদ্র) বাড়ছে। গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে লিকেজের খোঁজ পায় কোম্পানিগুলো। এরপর তা মেরামত করা হয়।

দীর্ঘদিনের লুণ্ঠন ও অব্যবস্থাপনায় তিতাসের এ পরিস্থিতি। এটি সমাধানের সক্ষমতা তাদের নেই। তিতাসের বোর্ডকে বিইআরসির কাছে জবাবদিহি করার কথা, যদিও সেটি বিইআরসি করতে পারছে না।
এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত গ্যাসের সরবরাহ কমছে। এতে সারা বছরেই গ্যাসের সংকট থাকে। এক খাতে কমিয়ে, আরেক খাতে বাড়ানোর মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হয়। প্রায় দেড় দশক ধরে আবাসিকে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ আছে। এর মধ্যেই পাইপলাইন মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি ঢুকে যাওয়ার কারণে প্রায়ই ভুগছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা।

রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস কোম্পানি। তিতাসের সূত্র বলছে, গত দেড় দশকে ঢাকায় বেড়েছে অবৈধ লাইন। নিয়মিত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও স্থায়ীভাবে তা অপসারণ করা হয় না। যদিও গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুসারে, এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা। এতে ওই বন্ধ পাইপলাইন দিয়ে পানি ঢুকে সচল পাইপলাইনে চলে যায়। বর্ষার সময় এটি বেশি হচ্ছে। পানি ঢুকলে তা বের না করা পর্যন্ত গ্যাস বন্ধ থাকে। দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কম থাকে বলে পানি বের করা যায় না, রাতে নিয়মিত কাজ করছেন তিতাসের কর্মীরা। এতে সময় বেশি লাগছে।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে এক দুর্ঘটনায় তিতাসের মূল পাইপলাইন ফেটে যায়। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত বিতরণ গ্যাসপাইপে পানি প্রবেশ করে। এতে অনেক দিন ভুগতে হয়েছিল আমিনবাজার থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত গ্রাহকদের।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ‘আমরা মোহাম্মদপুরবাসী’ নামে একটি গ্রুপ আছে। এখানে গত শুক্রবার শারমীন আফরোজ লেখেন, কয়েক দিন হলো গ্যাস নেই। কেউ কি এগুলো দেখার নেই। আগে তা-ও বেলা তিনটায় গ্যাস আসত, এখন চুলা চালুই করা যাচ্ছে না। তাঁর এই পোস্টের কমেন্টে আরও কয়েকজন গ্যাস না থাকার কথা জানিয়েছেন।

তিতাসের ভাষ্য

তিতাস সূত্র বলছে, প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ অভিযোগ আসে তিতাসের কেন্দ্রীয় জরুরি গ্যাস নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে। এর মধ্যে অধিকাংশই গ্যাস লিকেজ-সংক্রান্ত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৩৫৩টি অভিযোগ আসে, যার মধ্যে গ্যাস লিকেজের অভিযোগ ৪ হাজার ৯০০টি। গ্যাস না থাকার অভিযোগ ছিল ২ হাজার ২৭৪টি, আর গ্যাসের কম চাপের অভিযোগ ছিল ২৫২টি।

তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) কাজী সাইদুল হাসান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, পাইপলাইন অনেক পুরোনো এবং বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই বৃষ্টি হলেই গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোনো বাসা থেকে অভিযোগ এলে তিতাসের কর্মীরা যাচ্ছেন, কোথাও ছিদ্র দৃশ্যমান হলে তা মেরামত করে দিচ্ছেন। যদিও ছিদ্র খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। এতে সময় লাগছে।

পেট্রোবাংলা বলছে, গ্যাস পাইপলাইনে ছিদ্রের কারণে অপচয়ও বাড়ছে। বিতরণ লাইনে প্রতিবছর গড়ে অপচয় হচ্ছে ৭ শতাংশের বেশি। এর বাইরে সঞ্চালন লাইনে অপচয় হয়েছে ২ শতাংশ। অথচ সব মিলে ২ শতাংশ অপচয় গ্রহণযোগ্য। গ্যাসের অপচয় রোধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ছয়টি গ্যাস বিতরণ সংস্থা। গ্যাস অপচয়ের জন্য দায়ী হচ্ছে পুরোনো, জরাজীর্ণ পাইপলাইন; গ্যাস সরবরাহ লাইনের গ্যাস স্টেশন রাইজারে লিকেজ (ছিদ্র); তৃতীয় পক্ষের উন্নয়নকাজে পাইপলাইন ছিদ্র হওয়া এবং আবাসিক খাতে প্রচুর অবৈধ সংযোগ। তবে এসব অপচয় রোধে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাইপলাইন নতুন করে বসাতে একটি প্রকল্প নিয়েছিল তিতাস। তবে নতুন সরকার আপাতত আবাসিক খাতে বিনিয়োগের পক্ষে নয়। শুধু জরুরি প্রয়োজনে পাইপলাইন মেরামত ও নতুন বসানোর নির্দেশনা দিয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিনের লুণ্ঠন ও অব্যবস্থাপনায় তিতাসের এ পরিস্থিতি। এটি সমাধানের সক্ষমতা তাদের নেই। তিতাসের বোর্ডকে বিইআরসির কাছে জবাবদিহি করার কথা, যদিও সেটি বিইআরসি করতে পারছে না। উল্টো সিস্টেম লসের নামে লুটপাটের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর তিতাসের ব্যর্থতায় মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।