মেয়ের মা হলেন সেই হালিমা

হাসপাতালে হালিমা আক্তার ও নবজাতকে হাসিমুখে চিকিৎসেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক
ছবি: সংগৃহীত

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মেয়ের জন্মের পর হালিমা আক্তারের বড় কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। মা ও মেয়ে সুস্থ আছেন। ১৬ বছর বয়সে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি বা মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিলেন হালিমা। মা হতে গিয়ে নানা ভোগান্তির মুখে পড়েন তিনি।

হালিমা প্রথম আলোকে তাঁর শারীরিক সমস্যাটি সহজ করে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, গর্ভে সন্তান বড় হচ্ছে, নাভির ওপরের অংশে বাচ্চার নাড়াচাড়া অনুভব করতে পারতেন। কিন্তু নাভির নিচ থেকে আর কোনো কিছু অনুভব করতে পারতেন না। কেননা মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়ার পর থেকে তাঁর শরীরের নিচের অংশে কোনো অনুভূতি নেই। তিনি চলাফেরা করেন ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারে।

এই প্রতিবেদকের মেসেঞ্জারে হালিমা জানিয়েছেন তিনি আজ বৃহস্পতিবার সকালে মেয়ের মা হয়েছেন। হালিমা আক্তার মেয়ের জন্ম দিয়েছেন রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ বা ওজিএসবি হাসপাতালে।

হালিমা আক্তারসহ প্রতিবন্ধী নারীদের মা হতে গিয়ে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা নিয়ে আজ প্রথম আলোর অনলাইনে ‘কেন বাচ্চা নিতে গেলেন, শুনতে হচ্ছে প্রতিবন্ধী নারীদের’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে হালিমা আক্তার জানিয়েছেন তাঁর ভোগান্তির কথা।

ওজিএসবি হাসপাতালে ভর্তির আগে হালিমা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন। তিনি কেন সন্তান নিতে গেলেন, তাঁর ওজন কীভাবে নেওয়া হবে—এ ধরনের অসংখ্য প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয়েছে। কোনো হাসপাতাল তাঁকে ভর্তি করে সন্তান প্রসব করানোর ঝুঁকি নিতে চায়নি। তাই ঘুরতে হয়েছে একাধিক হাসপাতালে। পরে তিনি ওজিএসবির হাসপাতালটিতে ভর্তি হন।

আরও পড়ুন

হালিমা আক্তার নিজেও সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স। সেখানে কিশোরী কর্নারে কাউন্সেলিংয়ের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলে তাঁকে নিজের হাসপাতালে না হলেও অন্য কয়েকটি হাসপাতালে সেবা নিতে গিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তিনি যেসব হাসপাতালে গিয়েছেন, সেখানকার চিকিৎসক, নার্স—সবাই সন্তান প্রসবের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। হাসপাতালগুলো প্রতিবন্ধীবান্ধব না হওয়ায় বিভিন্ন সেবা নিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল।

সন্তান প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসছে, অথচ কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না বা ভর্তি হলেও সেবা পাবেন, সে নিশ্চয়তা পাচ্ছিলেন না বলে হালিমা আক্তার প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে হালিমা আক্তারের সমস্যার কথাটি জানানো হয়েছিল ওজিএসবির সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক লায়লা আরজুমান্দ বানুকে। তিনিই হালিমাকে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন।

আজ বিকেলে অধ্যাপক লায়লা আরজুমান্দ বানু প্রথম আলোকে বলেন, মা ও মেয়ে সুস্থ আছেন। হালিমার শারীরিক জটিলতার ধরন বুঝে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করেছেন। হালিমাকে শুধু ওষুধের দাম ছাড়া অস্ত্রোপচারের অন্য কোনো খরচ দিতে হবে না বলেও জানালেন এ অধ্যাপক।

হালিমার অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়ার (রোগীকে অস্থায়ীভাবে অবেদন করা) দায়িত্বে ছিলেন ওজিএসবির জ্যেষ্ঠ অবেদনবিদ দীপঙ্কর সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হালিমাকে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর টোটাল ইন্ট্রাভেনাস অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। হালিমার শরীরের নিচের অংশ অবশ, তাতে তিনি কোনো ব্যথা অনুভব করতে পারেন না। দুই পা একা নাড়াতে না পারলেও স্টিমুলেশন পেলে খিঁচুনি হয়। তাই অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর বেলায় যা যা প্রয়োজন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সন্তান প্রসবের পরবর্তী ধাপগুলোতে তিনি যাতে ব্যথা না পান, তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

হালিমাকে যে ব্যবস্থাপনায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, তা প্রথম অভিজ্ঞতা ছিল বলে উল্লেখ করে দীপঙ্কর সাহা বলেন, হালিমা আক্তার নিজেও একজন নার্স। তিনি তাঁর সীমাবদ্ধতা বা জটিলতাগুলো সম্পর্কে জানতেন বা সচেতন ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পুরো প্রক্রিয়ায় চিকিৎসকদের সহায়তা করেছেন। আর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তির আগেই তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হয়। কাউন্সেলিং করা হয়।

হালিমার অস্ত্রোপচার করেন ওজিএসবির জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট বিউটি রানী রায়। এ ধরনের অস্ত্রোপচার করার অভিজ্ঞতা এটিই প্রথম উল্লেখ করে বিউটি রানী রায় বললেন, হালিমার স্বাভাবিক প্রসবের ইচ্ছে ছিল। তবে মা ও সন্তানের সুস্থতা বিবেচনায় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হালিমার প্রসব–পরবর্তী রক্তক্ষরণসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়নি।

বিউটি রানী রায় হালিমার মা হওয়ার প্রক্রিয়াটিকে ‘ব্যতিক্রম উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কাউন্সেলিং করলে এবং চিকিৎসকেরা পর্যাপ্ত সময় এবং মনোযোগ দিলে হালিমাদের মতো প্রতিবন্ধী নারীদের মা হওয়ার প্রক্রিয়াটিকেও সহজ করা যায় বলেই বললেন তিনি।