মতিঝিলে মেট্রোস্টেশনের নিচ থেকে পাওয়া বোমার উৎস খুঁজছে পুলিশ

বোমাটি নিষ্ক্রিয় করছে ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। ২৪ জুলাই সন্ধ্যায় বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়ছবি: ডিএমপির সৌজন্যে

রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে বোমার উৎস, কারা এটি সেখানে রেখেছে এবং এর পেছনে কোনো উগ্রপন্থী নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কেরানীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া বোমা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লার সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এ ঘটনার সম্ভাব্য যোগসূত্রও যাচাই করা হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার রাতে মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক মির্জা মোহাম্মদ মুক্তা বাদী হয়ে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলাটি করেন। বেআইনিভাবে বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ বহন বা ব্যবহার এবং অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র করার অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়।

মামলা তদন্ত করছে মতিঝিল থানা-পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, বোমা রাখার ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। বোমার উৎস এবং জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।

মতিঝিলে মেট্রোস্টেশনের নিচে জেনারেটর রুমের কাছে একটি ছাতার ভেতরে বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পায় কর্তব্যরত পুলিশ। পরে পুলিশের বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ দল বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। এ সময় চোখে স্প্লিন্টার লেগে আহত হন পথচারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী মিরাজ হোসেন। নিষ্ক্রিয় করা বোমাটি আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)।

মামলার বিবরণে বলা হয়, শুক্রবার বেলা একটায় উল্টো রথযাত্রা উপলক্ষে শোভাযাত্রা ছিল। শোভাযাত্রাটি ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর প্রদক্ষিণ করে স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে শেষ হয়। উল্টো রথযাত্রায় মতিঝিল এলাকায় কর্তব্যরত ছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট কাওছার হোসেন। সন্ধ্যা ছয়টায় তিনি ডিএমপি কন্ট্রোল রুমকে জানান, মেট্রোস্টেশনের নিচে একটি ছাতা পাওয়া গেছে এবং ছাতার ভেতরে আলো জ্বলছে। এরপর দ্রুত পুলিশ গিয়ে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে।

পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের সহকারী কমিশনার হোসেন মোহাম্মদ ফারাবী প্রথম আলোকে বলেন, কারা কীভাবে, কখন বোমাটি রেখেছে, তা ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়নি। তবে ওই এলাকার কিছু সিসি ক্যামেরা নষ্ট। ধারণা করা হচ্ছে, উল্টো রথযাত্রা মেট্রোস্টেশন অতিক্রম করার সময় বোমাটি রাখা হয়েছে। রথযাত্রায় নাশকতার উদ্দেশ্যে এটি রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

চার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ

গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার একটি বাড়িতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। উম্মুল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার নামে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর বাড়িটির চারপাশের দেয়াল ও ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। পরে ওই বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন, নাইট্রিক অ্যাসিড এবং প্রায় ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক। এ ছাড়া কালো প্লাস্টিকে মোড়ানো নয়টি তাজা বোমাও উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই মাদ্রাসার পরিচালক শেখ আল আমিনসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী ও কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র আছে কি না, যাচাই করা হচ্ছে।

ওই সময় পুলিশ বলেছিল, আল আমিন বোমা তৈরির সময় এক অসতর্ক মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আল আমিন, তাঁর স্ত্রী ও সন্তান আহত হন। স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে রেখে আল আমিন পালিয়ে যান। তিনি আইএস-মতাদর্শী উগ্রপন্থী সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য। অতীতেও উগ্রবাদী তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল।

কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণের পর গত মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া আরও তিনটি ঘটনার সঙ্গে এই উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে তল্লাশির সময় পুলিশের ওপর হামলা করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত। পালানোর সময় দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া ব্যাগ থেকে কয়েকটি বোমা উদ্ধার করা হয়। সেই বোমার সঙ্গে কেরানীগঞ্জে উদ্ধার করা বোমার মিল পাওয়া গেছে। এরপর গত মার্চে রাজধানীর সায়েদাবাদের জনপদ মোড় এলাকায় পুলিশের তল্লাশির সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই মাসে কুমিল্লা শহরের একটি শিবমন্দিরেও বিস্ফোরণ হয়। এসব ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শেখ আল আমিনের ঘনিষ্ঠ দুজনকে শনাক্ত করে পুলিশ। তাঁরা হলেন নাজমুল হাসান মামুন ও মোহাম্মদ আরিফ। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনটি ঘটনাতেই এই দুজনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

ডিএমপির সিটিটিসি সূত্র জানায়, কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরিত বোমা ছিল হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, এসিটোন ও নাইট্রিক অ্যাসিডের তৈরি। আর মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচ থেকে উদ্ধার করা বোমাটি জাআই পাইপের মধ্যে তৈরি। সেটাতে সার্কিট ও ব্যাটারি যুক্ত ছিল। কেরানীগঞ্জের বিস্ফোরণসহ আগের তিনটি ঘটনার সঙ্গে সর্বশেষ বোমা উদ্ধারের ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।