স্ট্রোক সেন্টারের পুরুষ ওয়ার্ডের ১১ নম্বর শয্যায় আছেন ইস্রাফিল মিয়া। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ইস্রাফিল মিয়ার স্ট্রোক করেছিল। অর্থাৎ তাঁর মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল।

ওই ওয়ার্ডে ৫০টি শয্যা। ২৯ জুন কোনো শয্যা খালি দেখা যায়নি। একই তলায় উল্টো দিকে মহিলা ওয়ার্ড। তাতেও ৫০ শয্যা। সেখানেও কোনো শয্যা খালি ছিল না।

প্রতিষ্ঠানের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক বদরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্ট্রোকের রোগীদের জরুরি চিকিৎসার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমরা জোগাড় করেছি, ব্যবহার করছি। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স ও সহযোগী জনবল আমরা নিয়োগ করেছি।’ স্ট্রোকের রোগীদের চিকিৎসার এত বড় কেন্দ্র সরকারি বা বেসরকারিভাবে দেশের আর কোথাও নেই। চিকিৎসকেরা দাবি করেছেন, এ অঞ্চলে এত বড় আর কোনো কেন্দ্র আছে কি না, তা তাঁদের জানা নেই।

চিকিৎসকেরা বলেছেন, স্ট্রোক তিন ধরনের। মস্তিষ্কের ভেতরের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়, একে বলে ইসকেমিক স্ট্রোক। আবার মস্তিষ্কের ভেতরের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হয়, একে বলে হেমারেজ। এ ছাড়া মস্তিষ্কের ওপরের রক্তনালি ফেটে যেতে পারে। এ ধরনের স্ট্রোককে বলে সাব অ্যারোনয়েড হেমারেজ।

তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভুল-বোঝাবুঝি আছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, হার্ট অ্যাটাকে বুকে ব্যথা করে, চাপ অনুভূত হয়, শরীর ঘামতে থাকে। স্ট্রোকে কথা জড়িয়ে যায়, মুখ বেঁকে যায়। স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি হাত-পা নাড়াতে পারেন না। এসব লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রোগীকে হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ নাকি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিতে হবে।

১০০ শয্যার স্ট্রোক সেন্টার

প্রতিষ্ঠানের দশম তলায় গিয়ে দেখা যায়, রোগীর আত্মীয়দের ওয়ার্ডে ঢোকার ব্যাপারে কড়াকড়ি ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট সময়ে একজন আত্মীয় রোগীর কাছে কিছু সময়ের জন্য যেতে পারেন। রোগীর কাছে কোনো আত্মীয় থাকার দরকার হয় না। রোগীর খাওয়াদাওয়া, প্রস্রাব-পায়খানা করানো, পাশ ফেরানো—সব ধরনের সহায়তা করেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী। গত সপ্তাহে দুই দিন স্ট্রোক সেন্টারে গিয়ে দুটি ওয়ার্ডে কোনো রোগীর শয্যার পাশে একজনও আত্মীয় দেখা যায়নি।

১০০ শয্যার এ স্ট্রোক সেন্টারে কাজ করেন ২০ জন চিকিৎসক। তাঁরা প্রত্যেকেই স্ট্রোক বিশেষজ্ঞ, এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। আছেন ৮০ জন নার্স। তাঁরাও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এ ছাড়া আয়াসহ অন্যান্য সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মী আছেন ৮০ জন। তাঁদের ওপরে আছেন সাতজন অধ্যাপক। দুই ওয়ার্ডেই ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা আছে।

চিকিৎসকেরা বলেছেন, স্ট্রোক হওয়ার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আনা সম্ভব হলে অধিকাংশ রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা সম্ভব। চিকিৎসা নিতে যত বিলম্ব হয়, পুরোপুরি সুস্থতার সম্ভাবনা তত কমে যায়।

অন্য হাসপাতালে চোখে পড়ে না

দুটি ওয়ার্ডই পরিষ্কার। সরকারি হাসপাতালে অপরিচ্ছন্নতার যে অভিযোগ আছে, তা স্ট্রোক সেন্টারের বিরুদ্ধে অচল। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এখানে সব সময় সক্রিয়।

নার্সরা সঠিক সেবা দেওয়ার জন্য নিজেরাই একটি তালিকা তৈরি করেছেন। তাতে বলা আছে: ঠিক রোগী, ঠিক চিকিৎসা, ঠিক ওষুধ, ওষুধের ঠিক মাত্রা, ঠিক জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ, ঠিক সময়, ঠিক নথিভুক্তিকরণ, ঠিক পরামর্শ, ঠিক প্রত্যাখ্যান এবং ঠিক যাচাই ও মূল্যায়ন।

১০টি ঠিক কাজের এ তালিকা নার্সরা নিজেরাই তৈরি করেছেন। এ তালিকা ওয়ার্ডে চোখে পড়ে। নার্সরা প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে এ তালিকা অনুসরণ করার চেষ্টা করেন।

তারপরও মানুষ ভুল করতে পারে, ভুল হতে পারে। যেমন: স্ট্রোকের রোগী নিজে পাশ ফিরতে পারেন না। তাঁকে পাশ ফিরিয়ে দিতে হয়। কিন্তু কোন রোগী কত সময় কোন দিকে পাশ ফিরে আছেন, তা ঠিক রাখা সম্ভব নয়।

এ সমস্যা সমাধানের জন্য নার্সদের প্রতি নির্দেশনা আছে নির্দিষ্ট সময় সব রোগীকে এক পাশে রাখতে হবে। সময় শেষে অন্য পাশে। যেমন: সব রোগীকে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডান পাশে কাত করে রাখতে হবে। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত বাঁ পাশে কাত করে রাখতে হবে। এভাবে সারা দিন-রাতের সময় ঠিক করা আছে। এর ফলে কোনো রোগী দীর্ঘ সময় এক পাশে কাত হয়ে থাকেন না। ওয়ার্ডে ঢুকলে দেখা যায়, অধিকাংশ রোগী যেকোনো এক দিকে পাশ ফিরে আছেন।

আছে নিয়মিত পরামর্শের ব্যবস্থা। রোগীদের আত্মীয়কে রোগী সম্পর্কে বা সম্ভাব্য ফলাফল জানানোর জন্য দুটো আলাদা কক্ষ আছে। হাতমাইকে শয্যা নম্বর ও রোগীর নাম ধরে তাঁর আত্মীয়কে ডাকা হয়। রোগীর অবস্থা বর্ণনা করা হয়। মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলেও তা বুঝিয়ে বলা হয়। এ কাজ করেন প্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরা।

২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি এ স্ট্রোক সেন্টার চালু হয়েছিল। ওই বছর ৪ হাজার ১৯ জন জটিল রোগী এ কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। এর পরের বছর চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৩৬২ জন। এখানে চিকিৎসা নিয়ে ৯০ শতাংশ রোগী বেঁচে গেছেন। চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তির পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমে যায়।

ইস্রাফিল মিয়ার ব্যাপারে কর্তব্যরত চিকিৎসক শাহীন মাহমুদ বলেছিলেন, পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই ইস্রাফিল মিয়ার মতো রোগীদের বাড়িতে করণীয় ব্যাখ্যা করে ছুটি দিতে হয়। ছুটি দিতে অনেকটা বাধ্য হন তাঁরা। কারণ, ছুটি দিতে বিলম্ব হলে গুরুতর রোগীর সারি লম্বা হতে থাকে।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন