চেনা এক পথতরুর গল্প

বয়স্ক বুদ্ধ নারকেলগাছ ১৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ঢাকা শহরে এ গাছ আছে মাত্র তিন থেকে চারটি স্থানে।

পায়রা চত্বরে বুদ্ধ নারকেলগাছ (মাঝে)। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের সামনেছবি: জাহিদুল করিম

গাছটা একেবারে একা! সমগোত্রের কেউ নেই আশপাশে। কয়েক হাত দূরে আছে বেরি, বট আর মেহগনি প্রজাতির গাছ। একহারা গড়ন নিয়ে একেবারে আকাশমুখী হয়ে উঠে যেতে চাইছে সে। এই গাছ নিজের প্রাণের বিনিময়ে মানুষের প্রাণরক্ষা করতে পারে। একসময় পরিচিত ছিল বজ্রপাতনিরোধী হিসেবে। তবে এখন আর সেসব কথা মানুষ মনে রাখে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনের প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির নাম ‘বুদ্ধ নারকেল’।

পরিবেশবিদেরা মনে করেন, এটি শতবর্ষী গাছ। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২–এর ৪ নং তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত গাছ এটি। অর্থাৎ এই গাছের কোনো ক্ষতি করলে তা হবে দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে দোষী ব্যক্তিকে।

একলা দাঁড়িয়ে থাকা মসৃণ বাকলের বৃক্ষটির শাখাপ্রশাখা একটু বিক্ষিপ্ত ধরনের। বয়স্ক বুদ্ধ নারকেলগাছ ১৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পুরো ঢাকা শহরে এ গাছ আছে মাত্র তিন থেকে চারটি স্থানে। একসময় সংখ্যায় আরও অনেক ছিল বলে উল্লেখ করে গেছেন বৃক্ষবিশারদেরা। তবে টিএসসির তিন রাস্তার মোড়ে একেবারে এজমালি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা গাছটি যে অনেকভাবে বিশেষ, তা নিয়ে কেউ তেমন ভাবে না।

সেদিন এক মাঝবয়সী দম্পতি এই গাছের তলায় বসে চা খেয়ে গেল আদা–লেবু দিয়ে। তাকাল না গাছের দিকে। তারা নিজেদের আলাপ শেষে স্মৃতিচারণার সুখ নিয়ে ফিরে গেল এক রিকশায় দরদাম করে। বিকেল থেকেই এই গাছের তলায় জমতে থাকে আসর। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলে একদল ছেলেমেয়ে আসে সন্ধ্যার দিকে হাতে গিটার নিয়ে। ওরা গান গায়, গাছটিও গান শোনে। প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়ানো গাছ। সেই প্রাচীরে কত মানুষ এসে রোজ বসে। দুপুরবেলা ভিড় একটু কম থাকে। তখন চড়ুই লাফিয়ে হাঁটে, আবার চলে যায় পাশের বটগাছে। বুদ্ধ নারকেলগাছের মাঝারি আকৃতির পাতার ঝোপটা এমন যে সেখানে বাসা বাঁধার জন্য পাখিদের বিশেষ সুবিধা হয় না। এর ওপর আবার এই শতবর্ষীর মাথার ওপর বছর দুই আগে বাজ পড়েছে। সে জন্য খানিকটা সৌন্দর্যহানি হয়েছে গাছটার।

বুদ্ধ নারকেলগাছ
ছবি: প্রথম আলো

শত বছর ধরে কত মানুষের কত মান-অভিমানের, আনন্দ-উল্লাসের সাক্ষী হয়ে আছে এই গাছ। ওর নিজেরও আছে অনেক রকম আনন্দ-বেদনার গল্প। তবে সত্যি গাছেদের চেতনার জগৎ কতটা তীব্র তা বুঝতে গেলে পড়তে হবে জগদীশচন্দ্র বসুর অব্যক্ত শিরোনামে লেখা কয়েক পাতার বইটি। ‘সাড়ার মাত্রা’ এবং ‘বৃক্ষে উত্তেজনা প্রবাহ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, আনন্দ-বেদনায় গাছের স্পন্দন পৃথক হয় সেই পরীক্ষার প্রমাণের কথা।

বুদ্ধ নারকেলগাছের ফলকে শুভ বলে মনে করেন কেউ কেউ। এর ভিন্ন আকৃতির ফলের জন্য মনে করা হয় এটি আশীর্বাদপ্রাপ্ত। এ গাছের ফলের গুণ ও স্বাদের সঙ্গে নারকেলের সম্পর্ক না থাকলেও দেখতে মিল রয়েছে। বিচিত্র আকারের জন্যই হয়তো একে অলৌকিক ভেবে বুদ্ধ নামটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শোনা যায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নাকি একসময় ভিক্ষাপাত্র হিসেবে এই গাছের শক্ত ফলের ব্যবহার করতেন। তাই বৌদ্ধ শব্দটি আছে নামে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে এ গাছের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই বলেই মনে করেন পরিবেশবিদেরা।

কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘রমনা পার্কের পরিকল্পনাবিদ ব্রিটিশ বাগানবিশেষজ্ঞ আর এল প্রাউডলক রমনা তৈরির সময় রেঙ্গুন থেকে কিছু গাছ এ দেশে এনেছিলেন। এ দেশের কিছু গাছ রেঙ্গুনে নিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, পাদাউক, তেলসুর, বুদ্ধ নারকেল এবং ব্ল্যাক বিন গাছগুলো এ দেশে মিয়ানমার থেকে আনা হয়েছে। বুদ্ধ নারকেলগাছটি সংরক্ষিত। তবে এ গাছের সঙ্গে ধর্মীয় কোনো সম্পর্ক আছে বলে আমার জানা নেই।’

এই পরিবেশবিদ জানালেন, একসময় বজ্রপাতনিরোধক হিসেবে এই গাছগুলো লাগানো হতো। বর্তমানে রমনা পার্কের ভেতর, টিএসসি এলাকায় বুদ্ধ নারকেলগাছ আছে। সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্টের ভেতর কিছু বুদ্ধ নারকেলগাছ লাগানোর খবর পাওয়া যায়। তবে সেসব বয়সে তরুণ গাছ। ঢাকার বুকে থাকা টিএসসির গাছটি শতবর্ষী বুদ্ধ নারকেল।

নিসর্গী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের গাছপালা নিয়ে লিখেছিলেন শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থ। বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৮০ সালে প্রথম প্রকাশিত সে বইটিতে স্থান পেয়েছে ঢাকা শহরের পথতরুদের কথা। সেই পথতরুর মধ্যে বিশেষ স্থান পেয়েছে বুদ্ধ নারকেল। শ্যামলী নিসর্গ বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বকশীবাজারের দিকে যাওয়ার পথে দেখা মিলবে বুদ্ধ নারকেলগাছের। বাস্তবে এই ক্যাম্পাসে এখন মাত্র দুটি বুদ্ধ নারকেলগাছ রয়েছে। আরেকটি গাছ শামসুন্নাহার হলের কাছে। তবে বিভিন্ন কারণে টিএসসির শতবর্ষী গাছটির অবস্থা এখন সংকটাপন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংসদও মনে করে, দীর্ঘদিনের ইতিহাস–ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বয়স্ক গাছটিকে রক্ষা করা দরকার। ২০২৩ সালে গাছের ওপর বজ্রপাতের কারণে ফেটে যায় এবং আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় গাছটি। পরিবেশ সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, গাছের ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন। সম্প্রতি এই গাছের ডাল ভেঙে একজন রিকশাচালক আহত হয়েছেন। মাস দুই আগে গাছটি রক্ষায় কিছু মরা ডাল কেটে এটিকে রক্ষার চেষ্টা করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আরবরিকালচার বিভাগ। পথচারীরা এখান দিয়ে চলাচলের সময় যদি মনে পড়ে, তাহলে একবার দেখে নেবেন এই পথতরুকে। নিচ থেকে এর মাথার দিকে দেখতে হলে পথিককে মুখ তুলে তাকাতে হয় অনেকটা উঁচুতে।