ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের দাবি। তাঁর খালাতো ভাই বলেছেন, তিন দিন আগে পাবনায় নাঈমের গ্রামের বাড়িতেও হামলা হয়েছিল। ঢাকায় আসার পরও তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। ‘মব’ সৃষ্টি করে তাঁকে পিটিয়ে মারা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হলেও পুলিশ এখনো এ ঘটনায় কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। পুলিশ বলেছে, বসুন্ধরায় ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হত্যাকারী শনাক্তে কাজ করছে তারা।
গত বুধবার রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নাঈম কিবরিয়াকে বহনকারী প্রাইভেট কারের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই মোটরসাইকেলের চালকসহ অজ্ঞাতনামা যুবকেরা ‘মব’ সৃষ্টি করে গাড়ি থেকে নামিয়ে এনে নাঈমকে পিটিয়ে আহত করেন। পরে তিনি হাসপাতালে মারা যান।
পুলিশ এমনটা জানালেও নাঈম কিবরিয়ার খালাতো ভাই রাকিবুল ইসলাম বিষয়টি অতটা সরল বলে মনে করছেন না। তিনি আজ শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, নাঈমের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় পাবনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা রয়েছে। ওই মামলা হওয়ার পর তাঁরা পাবনার সদর থানার চক জয়েনপুরের বাসা থেকে সপরিবার পালিয়ে যান। কিন্তু মাঝেমধ্যেই চক জয়েনপুর তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ তিন দিন আগে মব সৃষ্টি করে নাঈমদের বাড়িতে হামলা করা হয়। বাড়িতে কেউ নেই আঁচ করতে পেরে হামলাকারীরা চলে যায়।
নাঈম কিবরিয়া পাবনা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী ছিলেন। তাঁর বাবার নাম গোলাম কিবরিয়া মুরগির খামারি। তাঁর মা আইরিন কিবরিয়া পাবনা জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল মেয়র।
মামলা থাকায় নাঈম পাবনার জজ আদালতে আইন পেশা চালাতে পারছিলেন না বলে জানান রাকিবুল ইসলাম। হাইকোর্ট থেকে ওই মামলায় জামিন নিতে ১০ দিন আগে ঢাকায় এসে পূর্বাচলে রাকিবুলের বাসায় ওঠেন।
রাকিবুল বলেন, তখন থেকে নাঈমকে অনুসরণ করা হচ্ছিল। বুধবার রাতে নাঈম তাঁর এক বন্ধুর প্রাইভেট কার নিয়ে পূর্বাচলের বাসা থেকে বের হন। রাত ১০টার দিকে বসুন্ধরা আই ব্লকের ১০ নম্বর সড়কে মব সৃষ্টি করে ও গাড়ি আটকানো হয় এবং নাঈমকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে যায়। ভাঙচুর করা হয় কারটিও।
নাঈমের ফিরতে দেরি দেখে রাকিবুল তাঁকে ফোন করেছিলেন। তখন বসুন্ধরা এলাকার এক নিরাপত্তাকর্মী তা ধরেন। নিরাপত্তাকর্মী বলেন, নাঈমকে মারধর করে ফেলে রাখা হয়েছে। এরপর রাকিবুল ঘটনাস্থলে গিয়ে নাঈমকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাকিবুল আরও বলেন, নাঈম যে হত্যা মামলার আসামি, সেই মামলায় তাঁর পূর্বপরিচিত পাবনার তিন ব্যক্তিও আসামি। ছয়-সাত মাস আগে ঢাকার মিরপুর এলাকায় মব সৃষ্টি করে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে সেনাসদস্যরা তাঁদের উদ্ধার করে মিরপুর থানায় হস্তান্তর করেন। মিরপুর থানার পুলিশ পরে তাঁদের পাবনার পুলিশে দেয়। সেখানকার পুলিশ হত্যা মামলায় ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায়। কিছুদিন আগে তাঁরা জামিনে কারাগার থেকে মুক্ত হন।
নাঈমের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমাউল হক আজ প্রথম আলোকে বলেন, হত্যার ঘটনাস্থল ও আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তারা গ্রেপ্তার হলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
এদিকে পারিবারিক সূত্র জানায়, আজ শুক্রবার পাবনার সদর থানার চক জয়েনপুরে মডেল মসজিদে জানাজা শেষে নাঈম কিবরিয়াকে সেখানের বালিয়াহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়। একমাত্র সন্তান হারিয়ে নাঈমের মা-বাবা এখন শোকে মুহ্যমান।