কওমি মাদ্রাসা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা আছে

‘ধর্মীয় সামাজিকীকরণে সময়, স্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: একটি এথনোগ্রাফিক গবেষণা’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচক ও শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ, ১০ সেপ্টেম্বরছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

কওমি মাদ্রাসা নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সমাজের বাইরে বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার প্রবণতা যেমন আছে, তেমনি কওমি মাদ্রাসাকে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে সরলভাবে যুক্ত করার ধারণাও রয়েছে। অথচ কওমি মাদ্রাসা সমাজেরই অংশ। তবে এর শিক্ষা, উদ্দেশ্য ও মানুষ তৈরির দর্শন সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। ‘ধর্মীয় সামাজিকীকরণে সময়, স্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: একটি এথনোগ্রাফিক গবেষণা’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজক কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগ। এটি বিভাগটির ‘কানেক্টিং অ্যানথ্রোপলজি’ সিরিজের তৃতীয় সেমিনার।

সেমিনারে আলোচকেরা মত দেন, কওমি মাদ্রাসা নিয়ে পূর্বধারণার বাইরে গিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরুল মোমেন ভূঁইয়া। তিনি বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা, ধর্মীয় সামাজিকীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর এথনোগ্রাফিক গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

অধ্যাপক নুরুল মোমেন বলেন, কওমি মাদ্রাসা আক্ষরিক অর্থেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে এর দর্শন ও উদ্দেশ্য সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মতো নয়। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এর মূল পার্থক্য শিক্ষার উদ্দেশ্য ও কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায় সেখানে। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস, আচরণ ও জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ ধরনের মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের পোশাক, চলাফেরা, আচরণ ও শরীরী ভাষার মধ্য দিয়েও ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ পায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘আদব’, ‘ইমান’, ‘আমল’ ও প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত ‘লাইন’—এসবের মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন ও আচরণ নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হয়।

নুরুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, কওমি মাদ্রাসাকে একক বা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্থানীয় অর্থনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা, দাতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময় ও ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও মাদ্রাসাগুলো স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থেকেছে। এটিকে তিনি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার কৌশল হিসেবেই দেখেন।

সেমিনারে মূল বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরুল মোমেন ভূঁইয়া। রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ, ১০ সেপ্টেম্বর
ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

গবেষণার কথা তুলে ধরে এই অধ্যাপক বলেন, ‘সন্ত্রাসের প্রজননক্ষেত্র’ হিসেবে মাদ্রাসাকে দেখার যে ধারণা তৈরি হয়েছে, সেটি সরলীকৃত। তাঁর গবেষণায় দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মাদ্রাসায় এনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে দীক্ষিত করে সন্ত্রাসী বানানোর এমন সরল প্রক্রিয়া তিনি দেখেননি। তাই কওমি মাদ্রাসা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নূরুল মোমেন আরও বলেন, ৯/১১, ‘ওয়ার অন টেরর’, লন্ডনের ৭/৭ হামলা এবং বাংলাদেশে ২০০৫ সালের বোমা হামলার পর মাদ্রাসা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের আগ্রহ ও সন্দেহ বেড়েছে। কওমি মাদ্রাসাশিক্ষাকে মূলধারায় আনার চাপও বেড়েছে। তবে রাষ্ট্রের এ ধরনের উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

নুরুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, নৃবিজ্ঞানীর কাজ কোনো পূর্বধারণা নিয়ে মাঠে যাওয়া নয়; বরং মানুষের জীবন ও আচরণ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে তা বোঝার চেষ্টা করা। তাঁর গবেষণায়ও পর্যবেক্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় নৃবিজ্ঞানীদের আরও গবেষণা করা দরকার। কারণ, সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যকার দূরত্ব ও বিভাজন বুঝতে হলে মাঠপর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন।

‘সমাজের দূরত্ব রয়েছে’

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজের অধ্যক্ষ কাজী জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্ত মানুষের সঙ্গে সমাজের কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অনেক লেখক এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছেন। তবে তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ধর্মীয় শিক্ষাকে মূলধারায় আনতে সরকারের বাড়তি সহায়তা ও বরাদ্দ প্রয়োজন। কিছু নেতিবাচক দিক থাকলেও এখন নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ধর্ম, ইসলাম ও মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়ে নৃবিজ্ঞানী ও গবেষকদের আরও কাজ করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আরমান হোসেন। তিনি মনে করেন, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে মূলধারার কর্মক্ষেত্র ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে সমাজে তাঁদের প্রভাবও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে ইসলাম ও ধর্ম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা বেশি ছড়ানোর বিষয়টিও গবেষণার মাধ্যমে বোঝা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট মুসতাইন জহির বলেন, নৃবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের সঙ্গে উপনিবেশবাদের সম্পর্ক রয়েছে। মাদ্রাসার মানুষ সমাজকে কীভাবে দেখে, সেটিও বোঝার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সমাজের বিভাজন ও দ্বন্দ্ব কমাতে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও গবেষণার পূর্বধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মো. মাহফুজ সরকার। আরও বক্তব্য দেন কলেজের কো-অর্ডিনেটর ও সহযোগী অধ্যাপক ফারজানা হক, শিক্ষক ও গবেষক আকমাল হোসাঈন প্রমুখ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, নৃবিজ্ঞান মানুষের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র। শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও এথনোগ্রাফিক অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের নৃবৈজ্ঞানিক চিন্তা আরও সমৃদ্ধ হবে।

সেমিনারে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।