‘ঈদের দিনে দায়িত্ব পালনে একধরনের ভালো লাগা কাজ করে’
আজ ঈদের দিন। এই দিনে বেশির ভাগ মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আছেন, উৎসব করছেন। তবে এমন দিনে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা আপনজনদের থেকে দূরে, কর্মস্থলে নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্বে। ছুটি নেই তাঁদের। বরং ঈদের দিনে তাঁদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে।
হাসপাতাল, সড়ক, থানার ভেতর কিংবা সংবাদকক্ষ-সবখানেই চলছে এমন মানুষদের ব্যস্ততা। মানুষের জন্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে কিংবা দুর্ভোগ লাঘবে তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকার অন্যতম বড় চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আজ শনিবার সকাল থেকে এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অনেকেই আসেন সেবা নিতে। কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, কেউবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ছুটে এসেছেন।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ঈদের দিনেও রোগীর চাপ কমে না। বরং অনেক সময় তা আরও বেড়ে যায়। তাই সকাল থেকেই তাঁরা ব্যস্ত রোগী দেখায়, তাঁদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ায়।
আজ দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কথা হয় জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক জ্যোতি ভাস্কর সাহার সঙ্গে। সে সময় চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নথিপত্র নিয়ে একের পর এক রোগীর স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে দেখা করছিলেন। তিনি সেগুলো দেখে পরামর্শ দিচ্ছিলেন।
ঈদের দিনে দায়িত্ব পালনে একধরনের ভালো লাগা ও তৃপ্তি কাজ করে বলে জানালেন জ্যোতি ভাস্কর সাহা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৮ সালে ইন্টার্ন চিকিৎসক থাকার সময় থেকে প্রতি ঈদেই আমি দায়িত্ব পালন করি। এ সময় সহকর্মীরা আমার ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে ঈদ উদ্যাপন করতে পারেন। এই অনুভূতি অন্য যেকোনো দিনে দায়িত্ব পালনের চেয়ে আলাদা। ঈদের দিন দায়িত্ব পালনে একধরনের ভালো লাগা কাজ করে।’
জ্যোতি ভাস্কর সাহা বলেন, ‘সেবা দেওয়ার দায়িত্ব বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টাই। তবে ঈদের দিন সে দায়িত্ব কিছুটা ভিন্ন মাত্রা পায়। অনেক রোগী আছেন, যাঁরা অন্য হাসপাতালে জরুরি সেবা না পেয়ে আমাদের কাছে আসেন। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে কেউ কেউ এখানে আসেন। আমরা চেষ্টা করি, তাঁদের প্রয়োজনীয় সেবাটা দিতে। এটাই আমাদের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি।’
ঈদের দিনে দায়িত্ব পালনকে পেশাগত কর্তব্যের পাশাপাশি সহকর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধতাসহ মানুষের পাশে থাকার একটি মানবিক সুযোগ হিসেবে দেখেন এই চিকিৎসক। ঈদের সময় দায়িত্বটা আরও বেশি অনুভব করেন বলেও জানান তিনি।
ঈদের ছুটিতে শহরের অনেকেই গ্রামে চলে গেছেন। তাই সড়কে যানবাহন কম। যানজটও তেমন নেই। কিন্তু যাঁরা আছেন, তাঁদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়কে দায়িত্ব পালন করছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। ঈদের দিন হলেও দায়িত্বে কোনো ছাড় নেই। তা ছাড়া ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এই দিনেও যানবাহনের চাপ থাকে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলের চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের সতর্ক থাকতে হয়।
আজ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিজয় সরণি মোড়ে (চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন) কথা হয় ট্রাফিক সার্জেন্ট মামুনুর রশিদের সঙ্গে। ঈদের নামাজের পর থেকে অনেকেই চন্দ্রিমা উদ্যানে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসছেন বলে জানালেন তিনি। মামুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের পেশা এমনই যে ঈদসহ যেকোনো বড় উৎসবের সময়ই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। অন্যদের ছুটির দিনে আমাদের দায়িত্ব বেশি থাকে।’
এ সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারকে সময় দিতে না পারার কষ্টও রয়েছে বলে জানালেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মামুনুর রশিদ। তিনি জানান, তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে তাঁর মা থাকেন। কিন্তু সেখানে তাঁর এই ঈদে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ঢাকায় স্ত্রী-সন্তান আছে। ঈদের দিনে ডিউটির কারণে তাঁদের সঙ্গেও সময় কাটানো সম্ভব হচ্ছে না তাঁর।
ট্রাফিক সার্জেন্ট মামুনুর রশিদ বলেন, ‘রাস্তায় যখন দেখি মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরছে, তখন খারাপ লাগে। মনে হয় অন্য কোনো চাকরি হলে হয়তো পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে পারতাম।’
দায়িত্বের মধ্যেই সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন মামুনুর রশিদ। তিনি জানান, ভোরে উঠে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাজে আসেন। সুযোগ বুঝে কাছেই সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ করে দ্রুত ছেলেকে আবার ৬০ ফুট এলাকার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসেন। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত তাঁর ডিউটি। সন্ধ্যায় পরিবার নিয়ে একটু ঘুরতে বের হবেন। তবে রাত সাড়ে ১০টায় আবার তাঁর ডিউটি রয়েছে।
শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পুলিশ সদস্যরা। বিভিন্ন থানা ও পুলিশ বক্সে দেখা গেছে, ঈদের দিনেও মানুষের অভিযোগ নিতে, টহল দিতে তাঁরা সক্রিয়। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা।
হাতিরঝিল থানার ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) পূর্ণ চিছাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ সময় সাধারণত পারিবারিক কলহ, চুরি, ছিনতাইয়ের মতো কিছু অভিযোগ আসে। বড় দুর্ঘটনার বিষয়ও থাকে। আমরা চেষ্টা করি, দ্রুত সেগুলো সমাধান করতে। বাইরে টহল টিমও নিয়মিত ঘুরছে।’
ঈদের সময় গণমাধ্যমকর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সাংবাদিকেরা ছুটে বেড়াচ্ছেন খবরের সন্ধানে। ঈদের জামাত, নগরীর পরিস্থিতি, মানুষের বেড়ানোসহ সবকিছুই তুলে ধরছেন তাঁরা।
আজ সকাল থেকেই ‘অ্যাসাইনমেন্ট কাভার’ করছেন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের নিজস্ব প্রতিনিধি রিয়াজ ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের তো সব সময়ই মাঠে থাকতে হয়। মানুষকে তথ্য জানাতে হয়। খবর জানানোর জন্য আমাদের উৎসব-আয়োজনের পাশাপাশি কাজও করতে হয়। তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে পরিবারের সঙ্গে থাকতে না পারার আক্ষেপও আছে।’
এ সময় সহকর্মীরাই পরিবার হয়ে ওঠেন বলেও উল্লেখ করেন এই গণমাধ্যমকর্মী।
পরিবহন খাতেও থেমে নেই ব্যস্ততা। বাসচালক, চালকের সহকারী (হেলপার), সিএনজি-রিকশাচালকেরা ঈদের দিনেও যাত্রী পরিবহন করছেন। অনেকেই গ্রামে না গিয়ে শহরে থেকে গেছেন জীবিকার তাগিদে।
মহাখালী আন্তজেলা বাসটার্মিনালে কথা হয় ঢাকা-হালুয়াঘাট গন্তব্যের ইমাম পরিবহনের বাসচালক মোহাম্মদ হানিফের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি বরিশালে। হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই আগে ঈদ শেষ করুক। বাড়ি যাক, ফিরে আসুক। তারপরে আমরা ঈদ করমু।’
ঈদে ঘরে বসে থাকলে আয় বন্ধ থাকে। তাই পরিবারকে সময় না দিয়ে কাজে বেরিয়েছেন বলে জানালেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রইচ মিয়া। যাত্রাবাড়ীর শনির আখরায় স্ত্রী ও ৫ সন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। পরিবার বড়, তাই রোজগার করতে আজও সড়কে নেমেছেন বলে জানান এই চালক।