ঈদুল আজহায়ও ঢাকায় গরুর মাংস বিক্রি কেন বেশি হয়

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি মাংসের দোকান, ২৫ মে ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

ঈদুল আজহায় দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখ লাখ পশু কোরবানি হলেও মাংসের চাহিদা কমে না, বরং এই সময়ে কিছু কারণে গরুর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। বছরের অন্য সময়ে ছোট মাংসের দোকানে এক থেকে দুই কেজি মাংস বিক্রি হলেও ঈদুল আজহার আগে এই বিক্রি বেড়ে চার থেকে পাঁচ কেজিতে পৌঁছায়।

কিছু মাংস বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে এমন অনেক পরিবারের কথা, যাঁরা কোরবানি দেন না বা দিতে পারেন না, তাঁরা ঈদের আগে বেশি মাংস কিনতে আসেন। ফলে এই সময়ে মাংসের দোকানে বেশি চাহিদা থাকে। এই চাহিদা মেটাতে বিক্রেতারা এই সময়ে বেশি গরু জবাই করেন। অন্য সময়ে এক থেকে দুই কেজি মাংস বিক্রি হলেও উৎসবের সময় তা কিছুটা বেড়ে চার থেকে পাঁচ কেজিতে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বাসাবাড়ি বা পরিবারগুলোতে নানা আয়োজনের কারণে গরুর মাংসের চাহিদা বাড়ে। পাশাপাশি ঢাকায় থাকা একক পরিবার এবং একা থাকা ব্যক্তিরাও এই সময়ে মাংসের বড় ক্রেতা বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

৪২ বছর ধরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গরুর মাংস বিক্রি করছেন বিক্রেতা মো. হাফিজ। তাঁর দোকানের নাম মো. হাফিজ এন্টারপ্রাইজ। ঈদুল আজহার আগে গত সোমবার দুপুরে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ঈদুল আজহায়ও মাংসের চাহিদা বেশি থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যারা কোরবানি দেয় না, তাঁরা মাংস কোথায় পাবেন? তাই তাঁরা এই সময়ে মাংস কিনতে আসেন, একবারে চার-পাঁচ কেজি করে নেন। ঈদে এমনিতেও বাড়িতে মাংসের চাহিদা বেশি থাকে। ব্যাচেলর লোকজনও আসে।’

নিজের মাংসের দোকানের সামনে বিক্রেতা মো. হাফিজ। কারওয়ান বাজার, ঢাকা। ২৫ মে ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

সাধারণত দিনে একটি বা চাহিদা থাকলে দুটি গরু জবাই করেন মাংস বিক্রেতা মো. হাফিজ। ঈদুল আজহার আগের দিন বুধবার তিনটি গরু জবাই করেন তিনি।

আরেক মাংস বিক্রেতা মো. ইব্রাহিমও একই কথা বলেন। ‘মায়ের দোয়া মাংস বিতান’-এর এই বিক্রেতা প্রথম আলোকে বলেন, অনেকেই কোরবানি দেন না, সে জন্য এই সময়ে তাঁরা মাংস কিনতে আসেন। ঈদে তো সব পরিবারেই মাংস প্রয়োজন হয়।

কোরবানি কমছে

ঈদুল আজহায় মাংসের চাহিদা বেশি হওয়ার কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, পশু কোরবানি দেওয়ার হার কমছে। ২০২০ সালে করোনা, ২০২২ সাল ও পরবর্তী উচ্চমূল্য এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মানুষের আর্থিক পরিস্থিতিকে দুর্বল করেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকটকালে পশু কোরবানি কমে। ২০১৭ সাল থেকে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি বাড়ছিল। ২০১৯ সালে পশু কোরবানি বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখে। এরপর এতসংখ্যক পশু আর কোরবানি হয়নি। এ বছর কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।

২০২০ সালে করোনা মহামারি দেখা দেয়। স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তা অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করে। আয় কমে যায় অনেকের, অনেকে হারান চাকরি। সেই সময় আগের বছরের তুলনায় ১১ লাখ ৬৪ হাজার পশু কম কোরবানি হয়। করোনা মহামারির সময়েই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও।

২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় প্রায় ১ কোটি ৪২ হাজার পশু কোরবানি হয়। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমলে ২০২৫ সালে ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা নেমে আসে ৯১ লাখ ৩৬ হাজারে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে।