চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে পিছিয়ে দেশ, বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ

‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযোগী প্রযুক্তি’ নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা। নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ৫ জুলাই ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রায় সব যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়। দেশের লাখ লাখ মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। এ সংকট উত্তরণে চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দেশকে স্বনির্ভর হতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

‘নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযোগী প্রযুক্তি’ নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। আজ শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন যৌথভাবে আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, বুয়েটের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাইবিট লিমিটেড এবং রিলিভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি বাংলাদেশ।

সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, দুঃখের বিষয় হলো স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও কাঁচি থেকে শুরু করে মানুষের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য সব যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানি করতে হচ্ছে, যা কাঙ্ক্ষিত নয়।

দেশের চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা দেশের জন্য কিছু করুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু করুন। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির জন্য প্রতিদিন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে যেকোনো বিষয়ে প্রণোদনা দিতে ও সব ধরনের সহযোগিতা করতে অত্যন্ত আগ্রহী।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি একবার এসে আমার সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশের জন্য কী করা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকব।’

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার সিদ্দিকী-ই রব্বানী। পাশাপাশি তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে চান উল্লেখ করে সিদ্দিকী-ই রব্বানী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে যদি সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

উদ্ভাবকেরা যতক্ষণ না উদ্যোক্তা হচ্ছেন, ততক্ষণ তাঁদের প্রযুক্তি মানুষের কাছে পৌঁছাবে না বলেও মনে করেন সিদ্দিকী-ই রব্বানী। স্টার্টআপগুলো যেন ঘর থেকে শুরু করতে পারে, সেই প্রস্তাব রেখে তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকে মনে করে অর্থ উপার্জনকারী লোক, প্রতারক এবং অপরাধী। সরকারি মেকানিজম (ব্যবস্থাপনা) তাদের হয়রানি করার জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এর মধ্যে একটি হলো কর আদায়কারীদের হয়রানি। এই হয়রানি করা লোকগুলোর হাত থেকে ছোট উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকদের সুরক্ষা দিতে হবে।

সম্মেলনে আরেকটি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এই সম্মেলনের সহসভাপতি অধ্যাপক তৌফিক হাসান। তিনি বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দেশকে স্বনির্ভর হতে হবে। এর মানে হলো দেশীয় সমাধান থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সোসাইটির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, বাংলাদেশ ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছে। যেসব উন্নয়নশীল দেশ পেটেন্ট আইন থেকে অব্যাহতি পেয়েছে, তাদের মধ্যে কেবল বাংলাদেশই এই সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে সরকারের উৎসাহ ও সমর্থন দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ বলেন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তি দ্রুত স্বাস্থ্যসেবাকে বদলে দিচ্ছে। এগুলোকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে তা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসাধারণ অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর লাখ লাখ মানুষ এখনো প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত। এর সমাধান কেবল উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানির মধ্যে নিহিত নয়; বরং চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে সাশ্রয়ী, স্থানীয়ভাবে প্রাসঙ্গিক ও টেকসই প্রযুক্তি গড়ে তোলার মধ্যেও রয়েছে।

চিকিৎসা খাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা ধরনের উদ্ভাবন করে যাচ্ছে উল্লেখ করে উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত একাডেমিক উদ্ভাবন তখনই সফল হয়, যখন জাতীয় নীতিতে তা গ্রহণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (উন্নত টেলিমেডিসিন) সরঞ্জামগুলো রাষ্ট্র গ্রহণ করলে গ্রামীণ গণ-স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলে যেতে পারে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক বি এইচ ব্রাউন ও পাকিস্তান ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েসনের মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল বাসিত।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকরাম হোসেন। এ সময় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কে এম তালহা নাহিয়ান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিকস অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী মৃত্তিকা হোসেন ও মো. উজায়ের বিন রফিক।