ঢাকার জলাবদ্ধতা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, দায়ী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচকেরা। জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা। ২৫ জুলাই ২০২৬ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়। এর জন্য দায়ী হলো সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা আর পরিকল্পনার ঘাটতি। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পানির স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।

আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত ‘বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার নির্বাহী সদস্য স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ, সেতু বিভাগ, নৌপরিবহন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।

ইকবাল হাবিব বলেন, এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে ঢাকার মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারবে না। অংশগ্রহণমূলক নগর শাসনই এর সমাধান। ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারলে দেশের অন্য শহরগুলোর জন্যও একটি গণবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির রেকর্ড ধরে ঢাকা শহরের ড্রেনের আকার নির্ধারণ করতে হবে। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ঢাকা শহরের ড্রেনের নকশা করার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা।

প্রকৌশলী ও পানি গবেষক অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, ঢাকা শহরের ড্রেনের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’ এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন করে দেশের ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ সিস্টেমের নকশা করতে হবে। ঢাকা শহরের সুয়ারেজের পাম্পগুলোকে হালনাগাদ করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলো জলাবদ্ধতার সমাধান খুব কমই করে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াসাকেই বেশির ভাগ সমাধান করতে হয়।

সেমিনারের বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকামুখী হওয়া কমাতে হবে। এ জন্য ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা বেড়েছে বলে মনে করেন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক স্থপতি খুরশিদ জাবিন হোসেন। তিনি বলেন, পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব।

দুর্যোগ তখনই ফিরে আসে, যখন মানুষ দুর্যোগের কথা ভুলে যায়—এ কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মো. আনিছুর রহমান বলেন, ড্রেনেজ সিস্টেমের হালনাগাদ করতে হবে।

মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ভুক্তভোগী, পরিবেশবিদ, সচেতন নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, সারা দেশের বড় শহরে জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। এর সমাধানে সরকারি-বেসরকারি ও জনগণের সমন্বয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির সেমিনার সঞ্চালনা করেন। তিনি জলাবদ্ধতা নিরসনে সাতটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন পেশাদার জনবল নিয়োগ; পুরো ঢাকা শহরকে পয়োবর্জ্য নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা; বিচ্ছিন্ন প্রকল্প গ্রহণ না করে নদী, খাল, লেক, জলাভূমি ও নিষ্কাশন নালাকে একটি আন্তসংযোগ–ব্যবস্থার মধ্যে আনা; দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা; বর্ষাকালে পানিনিষ্কাশনে পাম্প-নির্ভরতা পরিহার করে জলাধার-খালের সঙ্গে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করা; সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রকৌশলগত বাস্তবভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করা।