ইমারত নির্মাণ বিধিমালার দায়

ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা কমার অন্যতম অনুঘটক হচ্ছে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি, যানজট ও অপ্রতুল নাগরিক পরিষেবা। ২০০৮ সালের ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এসব সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়েছে। এ বিধিমালায় কোনো ধরনের বিবেচনা ছাড়া অস্বাভাবিক হারে ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ বা এফএআরের মান সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ১৫ থেকে ৬ দশমিক ৫ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। মূলত এফএআরের মানের মাধ্যমেই ভবনের আয়তন ও উচ্চতা নির্ধারিত হয়। এ কারণে এফএআরের মান বেশি হলে ভবনের আয়তন বাড়ে ও অতি উঁচু ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়।

ফলে গত প্রায় ১৪ বছরে ধানমন্ডি, গুলশানসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক উচ্চতার আবাসিক ভবন তৈরি হয়। ভবনের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হয়, বাড়তে থাকে এলাকার জনঘনত্ব। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান খেলার মাঠ, উদ্যান ও বিভিন্ন নাগরিক সেবার ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং অপ্রশস্ত সড়কে যানজট বেড়ে যায়।

অথচ পাশের দেশ ভারতের দিল্লি শহরের ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী এফএআরের সর্বোচ্চ মান ৩ দশমিক ৫ এবং ব্যক্তিগত প্লটে ১৫ মিটার বা পাঁচতলার ওপর ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। চেন্নাই শহরে ১০ কাঠা পর্যন্ত প্লটের ক্ষেত্রে ভবনের উচ্চতা হয় পাঁচতলা পর্যন্ত। বেঙ্গালুরুতে এফএআরের মান সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৭৫ ও সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ২৫ এবং ৩০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তার পাশে চারতলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যায়।

ভুল সংশোধনের উদ্যোগ

নগর-পরিকল্পনায় জনঘনত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় জনসংখ্যা, জনঘনত্ব এবং শহরের বিদ্যমান অবকাঠামো ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধাদির সাপেক্ষে শহরের ভার বহনক্ষমতা বিবেচনা না করা হলে, যেকোনো শহর তার বাসযোগ্যতা হারায়।

ঢাকা শহরের ধারণক্ষমতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৮১ ভাগ ওয়ার্ডেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি (একরে ২০০ জনের বেশি) মানুষ বাস করে। ঢাকার বাসযোগ্যতা কমার পেছনে এমন জনঘনত্ব অনেকাংশে দায়ী। ঢাকার জনঘনত্ব যাতে একটি সহনীয় পর্যায়ে থাকে এবং শহরটি যেন বাসযোগ্য হয়, সে জন্য নতুন ড্যাপে এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি করা হয়েছে ২০০৮ সালের বিধিমালায় উল্লেখ করা এফএআরের মান সংশোধনের মাধ্যমে। সংশোধিত মান অনুযায়ী, মূল ঢাকা শহরে আগের চেয়ে কম আয়তন বা উচ্চতার ভবন নির্মাণ করতে হবে। আর ড্যাপের এ বিষয়টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আবাসন ব্যবসায়ী ও স্থপতিদের সংগঠন জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে ‘বৈষম্যমূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

কিন্তু তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, স্বতঃস্ফূর্ত ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এলাকায় অপ্রশস্ত রাস্তার পাশে বহুতল ভবন করতে দিলে আপাতদৃষ্টে জমির মালিক হয়তো লাভবান হবেন। তবে ওই সব ভবনে অধিক মানুষের বসবাসের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ওই এলাকায় জনসংখ্যা আরও বাড়বে, যদিও সেই অনুপাতে উন্মুক্ত স্থান ও নাগরিক সেবা দেওয়ার মতো ভূমি না থাকায় যানজট ও জলাবদ্ধতা বাড়বে, নাগরিক সেবার মান আরও কমবে। একপর্যায়ে ওই এলাকা স্থবির হয়ে যাবে। তখন কি কোনো আবাসন ব্যবসায়ী বা পেশাদার পক্ষ এর দায় নেবে? ফলে জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে আগের করা ভুলের সংশোধন হিসেবেই দেখতে হবে, বৈষম্য হিসেবে নয়।

ফ্ল্যাটের দাম ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

নতুন ড্যাপের কারণে ঢাকায় সুউচ্চ ভবন নির্মাণের সুযোগ কমলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে বলে একটি পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ভবনের উচ্চতার সঙ্গে ফ্ল্যাটের দামের সম্পর্কে খুবই সামান্য, এর সঙ্গে নানাবিধ বিষয় জড়িত। ২০০৮ সালের আগে ধানমন্ডি, গুলশান, মিরপুরে ছয়তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যেত। ২০০৮ সালের বিধিমালাটি কার্যকরের পর, একই জমিতে ১২ থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু ফ্ল্যাটের দাম কমেনি, বরং বেড়েছে। এখন ধানমন্ডি ও গুলশান এলাকায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ১৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

নিম্নবিত্তের আবাসন ও ড্যাপ

ঢাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। ঘিঞ্জি ঘর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁদের থাকতে হয়। পানি, বিদ্যুৎসহ মৌলিক নানা সেবা নিয়ে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়। এই জনগোষ্ঠী যাতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে থাকতে পারে, সে জন্য এবারের ড্যাপে ‘সাশ্রয়ী আবাসন’ নামে¯স্বতন্ত্র প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে। নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য ড্যাপে রাজউকের আওতাধীন এলাকায় ৫৮টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানে মোট এক লাখ ইউনিট ছোট ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে কয়েক লাখ মানুষের বাসস্থান নিশ্চিত হবে। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক।

এ ছাড়া ড্যাপে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য সুলভ মূল্যের আবাসন সুবিধা রাখতে ড্যাপে প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো ভবনমালিক তাঁর ভবনে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য ছোট আয়তনের (৬০০ বর্গফুটের মধ্যে) পাঁচটি ফ্ল্যাট নির্মাণ করলে ওই ভবন মালিককে প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রণোদনা হিসেবে ওই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে এফএআরের মান শূন্য দশমিক ৭৫ বেশি দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে ভবন মালিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ—উভয় পক্ষই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকছে।

ব্লকভিত্তিক আবাসন

ঢাকা শহরে জমির সংকট প্রকট। এমন সংকটের কারণে সরকারি উদ্যোগে এলাকাভিত্তিক পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণ করা ব্যয়বহুল। কিন্তু ড্যাপে ব্লকভিত্তিক আবাসনের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক ছোট পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে।

ড্যাপের এ প্রস্তাব তাই প্রশংসনীয়। এ পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান রেখে এবং অপেক্ষাকৃত ছোট প্লটগুলো একত্র করে ব্লক আকারে ভবন নির্মাণ করা। এতে তুলনামূলকভাবে বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা যাবে। যত্রতত্র নগরাঞ্চল সম্প্রসারণ কমিয়ে শহরের নিচু ও কৃষিজমির সুরক্ষা দেওয়া যাবে। পাশাপাশি ওই ব্লকে বসবাস করা শিশু-কিশোরেরা উন্মুক্ত স্থানে খেলাধুলার সুযোগ পাবে।

বিকেন্দ্রীকরণে উৎসাহ

রাজউক এলাকায় অভ্যন্তরীণ বিকেন্দ্রীকরণে উৎসাহিত করা হয়েছে। ড্যাপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের পাশের এলাকা কেরানীগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর এবং রূপগঞ্জ এলাকার অনেক জমি ২০১০ সালের ড্যাপে গ্রামীণ বসতি হিসেবে চিহ্নিত ছিল। অর্থাৎ এসব জমিতে দুই তলার চেয়ে বেশি উঁচু আবাসিক ভবন নির্মাণ করা যেত না। কিন্তু নতুন ড্যাপে এসব এলাকায় চার-পাঁচতলা পর্যন্ত আবাসিক ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন করলে এবং কিছু জায়গা উন্মুক্ত রাখার শর্তে আরও বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মিশ্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি সড়কের প্রশস্ততা ৮০ ফুটের বেশি হয়, সেখানে শতভাগ বাণিজ্যিক স্থাপনা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; যেখানে এফএআরের মান আগের চেয়ে বেশি পাওয়া যাবে। এতে এসব এলাকায় আগের চেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় গাজীপুর অঞ্চলে প্রতি একরে গড়ে ১৮ জন, কালীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ অঞ্চলে প্রতি একরে গড়ে ১০ জন, সাভার অঞ্চলে গড়ে ২১ জন এবং কেরানীগঞ্জে প্রতি একরে গড়ে ১৯ জন বাস করতেন। নতুন ড্যাপের প্রস্তাব অনুযায়ী, এলাকাগুলোতে প্রতি একরে গড়ে ১৮০ থেকে ২০০ জন মানুষ যাতে বাস করতে পারে, সেই সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিকেন্দ্রীকরণকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

গণপরিবহনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার

একটি কার্যকর মহানগরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাধাহীন দ্রুত চলাচল, যা বর্তমান ঢাকার ক্ষেত্রে প্রায় অচিন্তনীয়। ঢাকা নগরের চলাচলে নৌপথের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এটি সাশ্রয়ী ও  পরিবেশবান্ধব। তাই ড্যাপে সড়ক ও রেলপথের সঙ্গে নৌপথকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ তিন মাধ্যমের সমন্বিত চলাচল ব্যবস্থাকে ড্যাপে ‘নগর জীবন রেখা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ জন্য সড়কপথ, নৌ ও রেলপথের সমন্বয়ে ৩ হাজার ২০৭ কিলোমিটার নগরজীবন রেখা স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ পরিকল্পনার আওতায় ঢাকার সঙ্গে আশপাশের শহরগুলোকে যুক্ত ও যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ছয়টি মেট্রো, দুটি বিআরটি, ছয়টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের সমান্তরালে দুটি প্রধান সড়ক, দুটি রিং রোড (বৃত্তাকার সড়ক), রিং রোডের সঙ্গে সংযুক্ত রেডিয়াল রোড এবং বৃত্তাকার নৌপথের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকার চারদিকে মোট ১৩টি আন্তজেলা বাস টার্মিনাল এবং দুটি ট্রাক টার্মিনালের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া এবারের ড্যাপে পথচারী ও অযান্ত্রিক যান চলাচলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যার অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরে ২০২ কিলোমিটার সাইকেল লেন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। জলাশয় এবং নৌপথের সমন্বয়ে ব্লু-নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ভিত্তিক অঞ্চলের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলে বৃহৎ আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

ড্যাপ বাস্তবায়নে করণীয়

নতুন ড্যাপেরও বাস্তবায়ন না হলে ঢাকা উন্নত দেশের রাজধানী তো দূরের কথা, পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের চেয়েও কয়েক গুণ খারাপ হবে, ঢাকা আরও বেশি অবাসযোগ্য হবে। তাই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) প্রত্যাশা করে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ এ পরিকল্পনার কর্মকৌশল অনুযায়ী নিজেদের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে। তা না হলে এবারও আগের ত্রুটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এ পরিকল্পনার বাইরে অথবা সাংঘর্ষিক কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন গ্রহণ না করা হয়, সে জন্য বিআইপি জোরালো দাবি জানায়।

আমরা মনে করি যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজউকের যে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা বর্তমানে অনুপস্থিত। তাই ড্যাপের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে, রাজউকের বোর্ড পুনর্গঠন করে, বোর্ডে পেশাজীবীদের যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বোর্ডের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে ১৩ সদস্যের বোর্ড গঠন করা অধিকতর সমীচীন হবে। এ ছাড়া ড্যাপের প্রস্তাব অনুযায়ী, ড্যাপ বাস্তবায়ন ও মূল্যায়নের জন্য উপদেষ্টা কমিটি এবং কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করতে হবে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স