হামে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ছটফট করছে মা হারানো ছোট্ট ইউসুফ

রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের আইসিইউতে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দুই বছরের শিশু ইউসুফের শিয়রে বসে আছেন দাদি ফিরোজা বেগম। মহাখালী, ঢাকা। ৮ জুন ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের ৯ নম্বর আইসিইউ। একটি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে দুই বছরের শিশু ইউসুফ। ছোট্ট শরীরজুড়ে লালচে ফুসকুড়ি। মুখে অক্সিজেন মাস্ক, আর নরম হাতে লাগানো আছে ক্যানুলা। পাশে বসে তার সেবা করছেন দাদি ফিরোজা বেগম (৬০)। মা-হারা এই শিশুর কাছে তিনিই এখন সব।

আজ সোমবার হাসপাতালে কথা হয় ফিরোজা বেগমের সঙ্গে। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি জানান, জন্মের সময় ইউসুফের মা মারা যান। সেই থেকে শিশুটিকে বুকে আগলে রেখেছেন তিনি। ফিরোজা বেগম বলেন, ‘এই পোলাডার জন্মের সময়ই হের মায় মইরা গ্যাল। এক ফোঁটা দুধও মুখে দেতে পারে নাই। হেইয়ার পর থাইক্যা মুই ওরে আগলাইয়া রাখছি।’

ছোট্ট ইউসুফসহ তার আরও তিন ভাইবোনের দেখাশোনা করেন তাদের দাদি ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, ‘হেয় তার মায়রে তো পাইছে না। এহন এমনে অসুস্থ হইছ। তার টেনশনে আমার গলা দিয়া ভাত নামে না।’

এক সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বরে ভুগেছে ইউসুফ। দিনমজুর বাবার সামর্থ্য ছিল না শুরুতেই বড় চিকিৎসক দেখানোর। স্থানীয় বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাইয়েছিলেন বাবা রুবেল বেপারী। ভেবেছিলেন সাধারণ জ্বর, সেরে যাবে। কিন্তু অবস্থা হিতে বিপরীত হয়। ভারী নিশ্বাস পড়া শুরু হয় ইউসুফের, শরীর ছেয়ে যায় হামের ফুসকুড়িতে। গতকাল রোববার তাকে রাজধানীর মহাখালীর এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটি হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, তার তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। সুস্থ হতে সময় লাগবে।

ইউসুফের বাবা রুবেল বেপারী পেশায় একজন ভ্যানচালক। আগে একটি পোশাক কারখানার ভ্যান চালিয়ে মাসে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা পেতেন। সেই সামান্য আয়ে চার সন্তান ও মাকে নিয়ে সংসার চালানোই দায়। সচ্ছলতার আশায় দুই মাস আগে ধারদেনা করে নিজের একটি ভ্যান নামান তিনি। কিন্তু ঈদের ছুটিতে শহর ফাঁকা থাকায় এখন রাস্তায় কাজ নেই, আয়ও বন্ধ।

হাসপাতালে চিকিৎসার বড় অংশ সরকারি হলেও আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন রুবেল। কামরাঙ্গীচরে আট হাজার টাকা ঘরভাড়া আর মা-হারা ইউসুফের দুধের খরচই মাসে সাত-আট হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকার প্রয়োজন। ছেলের এই টানাটানি দেখে বৃদ্ধ বয়সেও মানুষের বাসায় কাজ নেন মা ফিরোজা বেগম। যদিও রুবেল তাঁকে নিষেধ করেন। রুবেলের ভাষায়, ‘মায়ে তো এহন কাম করতে পারে না। আমি না করি। কিন্তু ট্যাকাপয়সার টানাটানি দেখলে হেয় কামে যায়।’

আইসিইউর বাইরের করিডরে মলিন মুখে বারবার পরিচিতদের ফোন দিচ্ছিলেন রুবেল। গতকাল এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ধার করে হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু গাড়িভাড়া আর জরুরি কিছু ওষুধ কিনতেই সেই টাকা শেষ। এখন পকেটে আর কিছুই নেই। রুবেল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আল্লায় যেমনে চালায়। আমি তো চেষ্টা করি বাড়তি কামাইতে। যহন যা কপালে জোটে তাই পাই।’

ডিএনসিসি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ভর্তি আছে ৩৬৬ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে আরও ৬৬ জন এবং বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছে ১৭৭ জন। চিকিৎসা শেষে ছাড়া পেয়েছে ৯৯ জন।