বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক এক কোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হয়। বছরে মাথাপিছু ৬৫ কেজি খাবার কখনো খাওয়া হয় না। যে পরিমাণ খাবার অপচয় হয় তার ৬১ শতাংশ হয় বাড়িতে পরিবারগুলো থেকে, ২৬ শতাংশ রেস্তোরাঁ থেকে এবং বাকি খাবার অপচয় হয় খাদ্যশস্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠান, সুপারশপ, দোকান ও বাজার থেকে। আজ রোববার রাজধানীতে দশম আন্তর্জাতিক নিরাপদ খাদ্য ফোরামের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

খাবারের অপচয়ের কারণের মধ্যে রয়েছে—প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিনে তা ব্যবহার না করতে পারা ও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে না পারা।

কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘খাদ্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর রাখা, ক্ষতি রোধ করা’ শিরোনামে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে যৌথভাবে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট বা ক্ষতি এবং অপচয় ঠেকাতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ অপচয় ঠেকানো গেলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যঘাটতি কমে আসবে এবং দারিদ্র্য–ক্ষুধার মধ্যে থাকা মানুষের কাছে বেশি পরিমাণ খাবার পৌঁছানো যাবে। তাঁরা আরও বলেন, ফেলে দেওয়া খাবার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে ভূমিকা রেখে জলবায়ুতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

অনুষ্ঠানে লিখিত তথ্যে জানানো হয়, দারিদ্র্য কমাতে কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ শক্ত অর্থনৈতিক অবস্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশ মোট উৎপাদনের ২২ শতাংশ খাদ্য খাতের এবং মোট শ্রমশক্তির ২ দশমিক ২ শতাংশ এ খাদ্য খাতে জড়িত। মোট রপ্তানির সাড়ে ৩ শতাংশ খাদ্য খাত থেকে আসে। তবে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের খাদ্য বিপণনবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ও কৃষি উদ্যোক্তারা এখনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছেন। কারণ, নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে রপ্তানি বাজারে নিয়ম মেনে চলার কড়াকড়ি ব্যবস্থা রয়েছে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ ১২১ দেশের মধ্যে ৮৪তম এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে ১৯১ দেশের মধ্যে ১২৯তম। ২০২২ সালের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশ ১০ দেশের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে।

বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে কাজ করতে আইএফসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয় অনুষ্ঠানে।

খাদ্য নষ্ট ও অপচয় বাড়াচ্ছে দারিদ্র্য

অনুষ্ঠানে ‘স্থায়িত্ব ও খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় রোধ’ শিরোনামের অধিবেশনে খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের আরও তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, মজুত, বিতরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। আবার ক্রেতা ও ভোক্তার কাছে কাছে পৌঁছানোর পর যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়। তবে খাদ্য অপচয়ের চেয়ে খাদ্য নষ্ট হওয়ার হার অনেক বেশি। যত খাদ্য নষ্ট হয় এর ৮৭ শতাংশই ঘটে উৎপাদন, মজুত, প্রক্রিয়া, বিতরণের সময় ও বাজারে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের গুরুতর প্রভাব পড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনে। এটি খাদ্যশস্য উৎপাদনে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে।

এ অধিবেশনে অংশ নিয়ে আর্ন্তজাতিক খাদ্যনিরাপত্তা এবং খাদ্য নষ্ট ও অপচয়বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইউরি জিভাজহেনকো বলেন, বিশ্বজুড়ে বছরে উৎপাদিত খাবারের এক–চতুর্থাংশ খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয়। এতে খাদ্যের পরিমাণ ও মান কমে গিয়ে খাদ্য সরবরাহ চক্রে ঘাটতি দেখা দেয়। এ অবস্থা প্রতিরোধে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা জানাসহ যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের জ্যেষ্ঠ কৃষিবিশেষজ্ঞ আমাদোউ বা বলেন, খাদ্য নষ্ট ও অপচয় ঠেকাতে পারলে খাদ্যপণ্যের দামও নাগালের মধ্যে থাকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে চাল, ডাল, মাছ ও ডালের ক্ষেত্রে খাদ্য বেশি নষ্ট হতে দেখা যায়।

মাস্টার কার্ড বাংলাদেশের পরিচালক জাকিয়া সুলতানা লাবণী বলেন, খাদ্য নষ্ট প্রতিরোধে কৃষকদের লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যাতে তাঁরা জানতে পারেন, উৎপাদনের সময় কী ধরনের উপাদান ব্যবহার করবেন। ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে সহায়তা করা যেতে পারে।

খাদ্য অপচয় রোধে জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ায়ও প্রয়োজন বলে মনে করেন ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেডের সাপ্লাই চেন লিড নাবিল ইমরান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ঠিক জায়গায় ঠিক লোকটি না থাকলে খাদ্য মান নিশ্চিত করা যায় না। খাবার ভোক্তার হাতে তুলে দেওয়ার আগে যেন নষ্ট না হয় সেভাবেই পরিকল্পনা করে তাঁরা কাজ করছেন।

অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন আইএফসির বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য ডায়াগনস্টিক প্রকল্প লিড হর্ষ বিবেক।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (খাদ্য পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ ইউনিট) মো. মমতাজ উদ্দিন বলেন, দেশের খাদ্য মান ও খাদ্য বিষয়ে বিনিয়োগ পরিকল্পনা পর্যবেক্ষণে রাখে এই সংস্থা।

অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, খাদ্যবাহিত ও পানিবাহিত রোগে বিশ্বজুড়ে বছরে ২২ লাখ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১৯ লাখই শিশু। এসব মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ধারণা করে, শুধু ঢাকায় মাত্র ৬টি রোগে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় বছরে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার। অথচ মানসম্মত খাদ্যব্যবস্থা নিতে পারলে এই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

খাদ্য ব্যবস্থাপনায় একটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে হবে

উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, কার্যকর নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা সৃষ্টিতে সবাইকে একটি প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে হবে। তা না হলে সুস্থ, সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, যাদের হাত ধরে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, তা বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইউম সরকার খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, কৃষি ব্যবসা শিল্পে বেসরকারি ও সরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এই ফোরাম শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য উদীয়মান বাজারেও খাদ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টায় অবদান রাখবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (কৃষি সম্প্রসারণ অনুবিভাগ) রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, খাদ্যশস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। প্রতিবছর চাষাবাদের উপযোগী জমি কমছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমাতে কৃষকদের মধ্যে আরও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব সালমা মমতাজ। স্বাগত বক্তব্য দেন আইএফসি বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কান্ট্রি ব্যবস্থাপক মার্টিন হল্টম্যান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিজ্ঞানী সিমোন মোরায়েস রাসজল।