বছিলায় নদী-খালঘেঁষা জীবনযাপন নিয়ে বুয়েটের গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ

মোহাম্মদপুরের বছিলা নিয়ে গবেষণাধর্মী বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অতিথিরা। শনিবার বিকেলে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগেছবি: প্রথম আলো

রাজধানী ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় নদী-খালঘেঁষা জীবনযাপন নিয়ে একটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের প্রকাশিত এ বইয়ের নাম কমনিং বিয়ন্ড এনক্লোজার: ইনহ্যাবিটেশন উইথ রিভার্স অ্যান্ড ক্যানালস ইন বছিলা।’

শনিবার বিকেলে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। বইটি সম্পাদনা করেছেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক শায়ের গাফুর, ফাতেমা মেহের খান ও আহাম্মদ-আল-মুহাইমিন।

এ বইয়ে বছিলা এলাকায় নদী, খাল, উন্মুক্ত স্থান ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কেন্দ্র করে নগরজীবন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা এবং নগরভিত্তিক যৌথ ব্যবহারযোগ্য সম্পদের ধারণাকে বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটিতে নগরের উন্মুক্ত স্থান, সবুজ এলাকা ও জলাশয়কে ব্যক্তিগত বা সরকারি মালিকানার বাইরে যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার বসবাসযোগ্যতার সংকট ক্রমেই বাড়ছে, যার পেছনে নগরের যৌথ সম্পদ কমে যাওয়া একটি বড় কারণ।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বায়ু ও শব্দদূষণ এবং তাপদাহের মতো পরিবেশগত সমস্যায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বইয়ে বছিলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদীসংলগ্ন বন্যার পানিপ্রবাহের এলাকা ও রামচন্দ্রপুর খাল কীভাবে আইনগত ও অবৈধ উপায়ে ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে গেছে, তা মানচিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আলোচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জনপরিসর, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রান্তিক মানুষের জীবন ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়ন ধারণাকে শুধু অবকাঠামো বা জিডিপি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনমান, পরিবেশ ও অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে ভাবতে হবে। পরিবেশ, নগর ও জীবিকার প্রশ্নে গবেষণাকে বাংলায় প্রকাশের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

গবেষণা বইটিতে মানুষের মতামত ও জীবনের বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়েছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, নগর-পরিকল্পনায় নারীর অভিজ্ঞতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। জনপরিসরগুলোকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ করতে হবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক মানুষকে সরিয়ে নগরায়ণ গড়ে তোলা হয়েছে; যেখানে আইন ও পরিকল্পনার নামেই সাধারণ মানুষের জমি, নদী, বন ও জনপরিসর দখল হচ্ছে। উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলনীতি কাজ করে; যেখানে দরিদ্র মানুষ ক্রমাগত স্থানচ্যুত হয় বলেও জানান তিনি।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানের মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, বইটিতে বছিলা এলাকার নগরায়ণ, পরিবেশ ও প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে—কীভাবে যৌথ সম্পদ ও জনপরিসর ক্রমেই ব্যক্তিগত দখলে চলে যাচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী জলাভূমি ও নদীর মালিকানা রাষ্ট্রের হলেও বাস্তবে প্লাবনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে, যা পরিবেশ ও নগরব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

অধ্যাপক শায়ের গফুর বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনপরিসর বা যৌথ সম্পদ বহুবার সামাজিক আন্দোলন ও পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়েছে। তাই জনপরিসরকে শুধু নান্দনিক বা অবকাঠামোগত দৃষ্টিতে নয়, সামাজিক অধিকার ও অংশগ্রহণের জায়গা হিসেবে দেখতে হবে। বছিলার গবেষণা সেই দখল ও রূপান্তরের বাস্তবতাকে সামনে আনে। এটি প্রান্তিক মানুষের সম্পৃক্ততায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ভাবনার আহ্বান জানায়।

বইটি প্রকাশ করেছে সেল ফর রেজিলিয়েন্ট ডুয়েলিং (সিইআরডি)। বিতরণ করছে দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড। ২৩৪ পৃষ্ঠার এ বইয়ের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা বা ৪০ মার্কিন ডলার।