দুটি সিটির রাজস্ব বিভাগ সূত্র বলছে, এর আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) ঢাকার দুই সিটি আয় করেছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সে বছর দুই সিটি করপোরেশন আয়ের মধ্যে দক্ষিণ সিটির আয় হয়েছিল ৭০৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা, আর উত্তর সিটির হয়েছিল ৮১১ কোটি ৩ লাখ টাকা।

এর আগে তিন অর্থবছরে সংস্থা দুটি যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছিল, তা পর্যায়ক্রমে বেড়েই চলছে। যেমন ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুই সিটির আয় হয়েছিল ১ হাজার ১৬৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয় হয় ১ হাজার ৩৯৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সংস্থা দুটি আয় করে ১ হাজার ১৩০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

নাগরিক সেবার বিপরীতে গৃহকর, ট্রেড লাইসেন্স, বাজার ভাড়া, রিকশার লাইসেন্স, রাস্তা খনন ফি, কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া, শৌচাগার ও পার্কিংয়ের জন্য ইজারা, জন্মনিবন্ধন ইত্যাদি থেকে রাজস্ব আদায় করে থাকে সিটি করপোরেশন। তবে এসব সেবা নিতে গিয়ে ক্ষেত্র বিশেষে নগরবাসীকে চরম হয়রানির স্বীকার হতে হয়। এর মধ্যে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের অনিয়মে ও দুর্নীতির দায়ে অবশ্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে। যেমন ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৪ (মিরপুর-১০) এ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুই মাস আগে এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

নগরবাসীরা যাতে ভোগান্তি ছাড়াই সেবা পান এ জন্য তাঁরা নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। দুর্নীতি কমাতে অঞ্চলগুলোয় তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন।
উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম

আর দক্ষিণের মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ইউসুফ আলী সরদারকে চাকরিচ্যুত করেন। পাশাপাশি লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক ইকবাল আহমেদসহ আরও কয়েকজনকে চাকরি থেকে অপসারণ করেন। অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব সেবা নিতে রাজস্ব বিভাগের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ কমেনি।

বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজের জন্য সিটি করপোরেশন রাস্তা খনন ফি খাতে রাজস্ব আদায় করলেও ঠিক সময়ে এসব কাজ শেষ না হওয়ায় সড়কে ভোগান্তিতে পড়ে পথচারী ও যাত্রীরা। এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আগে বিভিন্ন সংস্থা সড়ক খনন করে ঠিক সময়ে কাজ শেষ করত না।

গত বছর থেকে এই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। নগরবাসীরা বলছে, সেবার বিপরীতে জনগণের কাজ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তবে সেবা নির্বিঘ্ন করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে দুই সিটিকে আরও মনোযোগী হতে হবে বলে মনে করেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সব ধরনের কাগজপত্র সঙ্গে নেওয়ার পরও ট্রেড লাইসেন্স করতে গিয়ে তাঁকে হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। পরে তিনি ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সহায়তা নেন।

গৃহকর খাতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবারও সবচেয়ে বেশি টাকা আয় করেছে। বিদায়ী অর্থবছরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এই খাতে আয় করেছে ৩২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর উত্তর সিটির আয় হয়েছে ৩৬৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর আগের বছর একই খাতে দক্ষিণ সিটির আয় ছিল ২৫৪ কোটি টাকা আর উত্তর সিটির ছিল ৩৪২ কোটি টাকা।

সম্পত্তি হস্তান্তর কর খাতে এবার দক্ষিণ সিটি ১২৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, আর উত্তর সিটি করেছে ২৪০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর এই খাতে দক্ষিণের আয় ছিল ১০৪ কোটি, আর উত্তরের আয় ছিল ১৬৪ কোটি টাকা।

বাজার সালামি তথা মার্কেট নির্মাণের আগে আগ্রহী ব্যক্তিদের থেকে প্রায় ১০৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে দক্ষিণ সিটি। এর আগের অর্থবছরে এই খাত থেকে আয় হয়েছিল ৩৮ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় তিন গুণ বেশি টাকা আদায় হলেও যাঁরা করপোরেশনের দোকান পেতে টাকা জমা দিচ্ছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও দোকান বুঝে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁনখারপুল এলাকায় একটি মার্কেটের দোকান পেতে চার বছর আগে পাঁচ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন বকশি বাজার এলাকার এক বাসিন্দা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুই বছর আগে ওই মার্কেটে দোকান বুঝে পাওয়ার কথা থাকলে এখন পর্যন্ত মার্কেটের বেজমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। শুনেছেন ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে মার্কেটের কাজ এগোচ্ছে না। গাফিলতির কারণে ওই ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল হয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। দোকান পেতে আরও কয়েক বছর লেগে যাবে।

স্থায়ী আমানত সুদ থেকে গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে দক্ষিণ সিটি। বিদায়ী অর্থবছরে এই খাত থেকে সংস্থাটির আদায় হয়েছে ৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে এই খাতে আয় ছিল ১৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

বিভিন্ন সেবার বিপরীতে নগরবাসীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও ভোগান্তি কমছে না কেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, নগরবাসীরা যাতে ভোগান্তি ছাড়াই সেবা পান এ জন্য তাঁরা নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। দুর্নীতি কমাতে অঞ্চলগুলোয় তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন।

দক্ষিণ সিটির মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের ভোগান্তি কমাতে তারা দুই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন। একটি হলো—বিভিন্ন ফি গ্রহণে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে ওয়ান স্টপ সেন্টার চালু করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো—যেসব কর্মকর্তা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেই মেয়র বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন