জুলাইয়ের চেতনা এ দেশে বাস্তবায়ন করে ছাড়ব: সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা

‘জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ওলামায়ে কেরামের অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথিরা। রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে, ১২ জুলাইছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের অর্জন বাস্তবায়ন না হলে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সুবিচার করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চলছে। মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

আজ রোববার রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে ওলামায়ে কেরামের অবদান’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাঁদের দায়িত্ব পালনকালে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এর মধ্যে ৯৮টি আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করলেও ৩৫টি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন করেই শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের শপথ নিতে হবে—জুলাইয়ের চেতনা এ দেশে আমরা বাস্তবায়ন করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ। শহীদদের রক্ত এবং আল্লাহর ওলিদের চোখের পানি কখনো বৃথা যায়নি। ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।’

‘ক্ষমতার স্বাদ নয়, দায়িত্বই ছিল বড়’

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরে সাবেক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে কার্যত প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। সংসদ ছিল না, সরকার ছিল না, অনেক থানায় আগুন দেওয়া হয়েছিল এবং পুলিশও দায়িত্বে ছিল না। সে সময় শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছে।

সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, ১৮ মাস তাঁরা দিন-রাত কাজ করেছেন। সরকারি গাড়িতে জাতীয় পতাকা থাকলেও ক্ষমতার কোনো স্বাদ তাঁরা পাননি। দায়িত্ব পালনের মধ্যেই তাঁকে অস্ত্রোপচারের পর বিদেশ থেকে ফিরে বিভিন্ন জেলায় সফর করতে হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের কবর জিয়ারত, আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

‘ঐক্য নষ্টে তৃতীয় শক্তির অপচেষ্টা থাকতে পারে’

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আ ফ ম খালিদ দাবি করেন, বিভিন্ন দলের মধ্যে কাদা–ছোড়াছুড়ি বাড়ছে। তাঁর ধারণা, এর পেছনে তৃতীয় কোনো শক্তিরও ভূমিকা থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘পানি ঘোলা করতে পারলে মাছ ধরা সহজ হয়। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আপনি এক দলের, আমি আরেক দলের—এতে সমস্যা নেই। কিন্তু জাতি, মিল্লাত ও দেশের প্রয়োজনে আমরা রাজপথে একসঙ্গে দাঁড়াব, হাতে হাত রাখব।’

‘জুলাই বিভাজনের নয়, ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে’

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় নিহত ও নির্যাতিত আলেম-ওলামা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশে জামায়াত দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মাদ্রাসাগুলোর খোঁজ নেওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আবদুল হালিম বলেন, বিগত সময়ে দাড়ি, টুপি ও পাগড়ি পরার কারণে বহু ইমাম-খতিব ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির কারণে অনেক খতিব স্বাধীনভাবে খুতবা দিতে পারেননি। জুলাইয়ের চেতনা বিভাজনের নয়, বরং সব ধারার আলেমদের ঐক্যের শিক্ষা দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী বলেন, ৩৬ দিনের আন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও এর পেছনে দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রাম রয়েছে। আলেম-ওলামারা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে সচেতন করেছেন এবং রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করেছে, যার ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলনের শক্তি তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন। তিনি বলেন, দেশে ন্যায়বিচার ও দ্বীনি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন ইসলামি স্কলার মুফতি কাজী ইব্রাহীম, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখের মহাসচিব মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী, মুসলিম জনতা ঐক্য পরিষদের আমির মাওলানা আজিজুর রহমান আজিজ, ছারছিনা দরবার শরিফের মাওলানা শাহ মুহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ সিদ্দিকী, মাওলানা আব্দুস সামাদ, সামিউল হক ফারুকী, আ ন ম রশিদ আহমাদ মাদানী, মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন, মাওলানা মীম আতিকুল্লাহ প্রমুখ।