জবিতে কর্মসূচি পালনে নিষেধাজ্ঞাতেও কাটেনি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক। ফটক দিয়ে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) যাচাই-বাছাই করছেন প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যসহ নিরাপত্তাকর্মীরা। ৬ আগস্টছবি: প্রথম আলো

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্‌যাপনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর মধ্যে রোববার বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের উপস্থিতির ঘোষণা ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

রোববার সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে ফল উৎসবের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পরে প্রক্টর অফিস কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়নি। এ অবস্থায় কর্মসূচির অনুমতি না পেলেও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন বলে জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রোববার ক্যাম্পাসে থাকব। প্রক্টরকে অপমানিত করার প্রতিবাদে আমরা মানববন্ধন করতে যাব। যদি সুযোগ না দেওয়া হয় তাহলে উপাচার্যের কাছে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়ে আসব।’

অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারাও রোববার ক্যাম্পাসে আসার কথা জানিয়েছেন।

ফলে সংঘর্ষের ঘটনার পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে এলেও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের উপস্থিতি ঘিরে আবারও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বিপদে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা চলার সময় এসব কর্মসূচির কারণে ক্যাম্পাসে তৈরি হচ্ছে বাড়তি উত্তেজনা। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাস ও পরীক্ষায় মনোযোগ ধরে রাখতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

এদিকে ‘আলফা সানডে’ নামে একটি কর্মসূচি দিয়েছে ‘ঐক্যবদ্ধ জগন্নাথ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের সামনে জড়ো হওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। ব্যানারে—‘জবি শিক্ষার্থীর ওপর সোহরাওয়ার্দী কলেজের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ হই’, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে জবিয়ানদের ঐক্যই শক্তি’, ‘ঐক্যের রোববার’, ‘ক্রিয়াশীল সংগঠনের যারা আসবে না, তারাই মূলত গাদ্দার!’—এমন স্লোগান লেখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার থাকলেও শিক্ষার পরিবেশ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠনগুলোর বিবেচনায় রাখা উচিত। একই সঙ্গে সংঘর্ষের পর প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়নেও আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আলী উল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেটার রেশ এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। এখনো মনে হচ্ছে না এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এসেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল। আমরা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চাই, বিশ্ববিদ্যালয় যেন সুষ্ঠু পরিবেশে ফিরে আসে।’

সংঘর্ষের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার ও সব ধরনের সভা-সমাবেশ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে প্রবেশ করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। ৫ আগস্ট মধ্যরাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স দেয়। এরপর ৯ দফা দাবি নিয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয় জকসু। হামলার সুষ্ঠু বিচার এবং প্রক্টরের অপসারণের দাবিতে প্রশাসনকে তিন কার্যদিবসের আলটিমেটাম দিয়েছিল জকসু।

এদিন বেলা দুইটার দিকে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তারা ক্যাম্পাসের পরিবেশ শান্ত ও স্থিতিশীল রাখার আহ্বান জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শান্ত রাখার স্বার্থে সব সংগঠনের জন্য একই নিয়ম বজায় রাখার দাবি জানায় তারা।

বেলা আড়াইটার দিকে উপাচার্যকে পাঁচ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করা, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর অস্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ বাস্তবায়ন এবং অছাত্রদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা।

এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসের রফিক ভবনের নিচে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল নিষিদ্ধ থাকবে। একটি ছাত্রসংগঠনের ফল উৎসব ছিল, সেটি বাতিল করা হয়েছে।

নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের মতোই থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি থাকবে। সবাইকে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে হবে।