চায়না আইসা আমার ব্যবসা শ্যাষ কইরা দিছে
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন ১২টি কামারের দোকান আছে। এর মধ্যে একটি কাজল মণ্ডলের। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই এখন এটি চালান।
তবে কাজল মণ্ডলের ব্যবসা এখন ভালো চলছে না। কারণ, তিনি ‘কাটানি’ নামে একধরনের কাঁচি তৈরি করেন। সেই কাটানি দিয়ে স্টেইনলেস স্টিলের শিট গোল করে কাটা যায়। পরে গোল শিট দিয়ে স্টিলের বাটি ও টিফিনকারির মতো নানা ধরনের জিনিসপত্র তৈরি করা হয়। এখন চীন থেকেই গোল করে কাটা শিট আমদানি করেন ব্যবসায়ীরা। ফলে স্টেইনলেস স্টিলের শিট কাটার জন্য এখন আর কাটানি লাগে না। এতে কাজল মণ্ডলের মতো কামারের কাজ কমেছে।
আড়াই দশক ধরে কামারের কাজ করা কাজল মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন আর আগের মতো কাজ নাই। আগে খুব ভালো ছিল। চায়নারাই আমাগো ব্যবসা খাইয়া হালাইছে। এখন চায়নারাই গোল করে কেটে ছাড়ে। এ জন্য আমাদের কাজটা কমে গেছে।’
দীপক কর্মকারের পরিবার থাকে চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে। আর তিনি থাকেন কারখানার ভেতরেই। দীপক বলেন, এই কামারের দোকানে তাঁরা ৮ জন কাজ করেন। দেশের সব জেলাতেই তাঁদের দোকানের মালামাল যায়। সৃষ্টিকর্তা তাঁদের ভালো রেখেছেন।
শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে থাকে কাজল মণ্ডলের পরিবার। আর তিনি থাকেন খ্রিষ্টানপাড়ায় (রাজধানীর ফার্মগেটসংলগ্ন)।
এখনো কাটানি তৈরি করেন কাজল মণ্ডল। স্টিলের আলমারি তৈরিসহ নানা কাজে শিট কাটতে এটি ব্যবহৃত হয়। কাজল মণ্ডল বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহায় তাঁর কাজ কমে গেছে।
তবে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে যখন কাজল মণ্ডলের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি চাপাতি তৈরির কাজ করছিলেন। কাজল মণ্ডল বলেন, তাঁর কাজ কম থাকায় পাশের আরেকজন দোকানি ‘টেম্পার’ (চাপাতি তৈরির একটি পর্যায়) দিতে বলেছিলেন, সেটি করছিলেন তিনি।
কারখানায় থাকেন তিনি, বললেন ভালো আছেন
কারওয়ান বাজারের জনতা ট্রেডার্স অ্যান্ড নোয়াখালী হার্ডওয়্যার নামের একটি কামারের দোকানে কাজ করেন দীপক চন্দ্র কর্মকার। ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য জবাই ছুরি, চাপাতিসহ নানা ধরনের যন্ত্র তৈরি করতে তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি কিছু লোহা চুলায় দিয়েছেন পোড়ার জন্য। সে সময় মাত্র তিন মিনিট সময় পাওয়া গেল তাঁর সঙ্গে কথা বলার।
দীপক কর্মকার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার হাত ধরে কামারের পেশায় আসেন তিনি। এখন তাঁর বয়স ৪৫। এখনো এই পেশায় আছেন তিনি।
জনতা ট্রেডার্স অ্যান্ড নোয়াখালী হার্ডওয়্যার নামে কামারের দোকানে ১৪ বছর ধরে কাজ করছেন দীপক কর্মকার। তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। প্রতিদিনের টাকা প্রতিদিনই মালিক তাঁকে বুঝিয়ে দেন।
সাধারণত দীপক কর্মকারের কাজের সময় সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা। কিন্তু কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সকাল থেকে রাত ১টা, কখনো রাত আড়াইটা পর্যন্ত তাঁকে কাজ করতে হয়। দীপক কর্মকার বলেন, তবে বাড়তি কাজ করলেও তিনি বাড়তি টাকা পান না।
দীপক কর্মকারের পরিবার থাকে চট্টগ্রামের গ্রামের বাড়িতে। আর তিনি থাকেন কারখানার ভেতরেই। দীপক বলেন, এই কামারের দোকানে তাঁরা ৮ জন কাজ করেন। দেশের সব জেলাতেই তাঁদের দোকানের মালামাল যায়। সৃষ্টিকর্তা তাঁদের ভালো রেখেছেন।
আবদুর রহমান বলেন, ‘চানরাতে সারা রাত কাজ করব। ঈদের দিন ভোরবেলা বন্ধ করে ফেলব।’ এবার ঈদে ভোলায় যাবেন না। পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ঈদ করবেন বলেও জানালেন তিনি।
‘চানরাতে সারা রাত কাজ করব’
৩০ বছর ধরে কামারের কাজ করেন আবদুর রহমান। তিনি একাই এই কাজ করেন। তাঁর পরিবারের কেউ এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
আবদুর রহমানের গ্রামের বাড়ি ভোলায়। থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়ায়। আট বছর ধরে কাজ করছেন কারওয়ান বাজারের একটি কামারের দোকানে। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সারা বছরই তাঁদের কাজ থাকে। কোরবানির মৌসুমে চাপ বেশি থাকে। এখন সকাল সাতটা থেকে তাঁকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়।
দৈনিক ১ হাজার ১০০ টাকা মজুরি পান উল্লেখ করে আবদুর রহমান বলেন, এর সঙ্গে ‘মহাজন’ এক বেলা খাবার দেন এবং নাশতার জন্য ৪০ টাকা দেন প্রতিদিন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ মোটামুটি ভালোই রাখছে।’
আবদুর রহমান বলেন, ‘চানরাতে সারা রাত কাজ করব। ঈদের দিন ভোরবেলা বন্ধ করে ফেলব।’ এবার ঈদে ভোলায় যাবেন না। পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ঈদ করবেন বলেও জানালেন তিনি।