জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও পদে বহাল কর্মকর্তারা

সিও জিনহির জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ায়। বাবা–মা দুজনই কোরিয়ান। থাকেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গেন্ডারিয়া এলাকায়। কিন্তু তাঁকে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। আবার রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আরমানও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়ে ঢাকার এই সিটি করপোরেশন থেকেই জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়েছেন।

জালিয়াতির এই দুই ঘটনা ধরা পড়েছে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের রেজিস্টার জেনারেলের কার্যালয়ের তদন্তে। এই জালিয়াতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেড় মাস আগে (২৬ এপ্রিল) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে ওই কর্মকর্তারা এখনো স্বপদে বহাল আছেন। অবশ্য একজন কর্মকর্তা ওই চিঠি আসার আগেই এ ধরনের আরেকটি জালিয়াতির ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন।

এই কর্মকর্তারা হলেন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধক (সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা) ফিরোজ আলম, মাহমুদা আলী ও আজিজুন নেছা এবং নিবন্ধন সহকারী নেসার আহমেদ ও বিলকিস আক্তার। রোহিঙ্গা মোহাম্মদ আরমানকে জন্মসনদ দেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ার পর গত ২২ মার্চ বিলকিস আক্তারকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া সনদ জালিয়াতির অপর ঘটনায় গত ফেব্রুয়ারিতে আজিজুন নেছাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।  

এ ধরনের জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সহায়তায় জন্মনিবন্ধন করছেন, বিষয়টি মারাত্মক সংবেদনশীল এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির। বিষয়টি ধরা পড়ার পরও কর্তৃপক্ষ দোষী ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এটা খুবই দুঃখজনক।

তবে রোহিঙ্গা ও দক্ষিণ কোরীয় নাগরিককে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার ঘটনায় এখনো কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এ দুই জালিয়াতির ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ফিরোজ আলম ও মাহমুদা আলী এখনো দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরিরত অবস্থায় আছেন ইপিআই সুপারভাইজার নেসার আহমেদও।

এখনো কেন দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পরে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি এখনো তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ রোহিঙ্গাকে জন্মনিবন্ধন সনদ

ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৪ থেকে জন্মনিবন্ধনের সনদ পান মোহাম্মদ আরমান। জন্মনিবন্ধনের আবেদন অনুযায়ী তাঁর স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম-হরিশপুর, ডাকঘর-সন্দ্বীপ আর বর্তমান ঠিকানা রাজধানীর মিরপুর। তাঁর আবেদনপত্রে তথ্য প্রদানকারী ও যাচাইকারীর প্রত্যয়ন অংশে কারও নাম ও স্বাক্ষর নেই। অর্থাৎ ওই আবেদন যাচাই করা হয়নি।

আবেদনে বয়সের প্রমাণ হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন বিধিমালায় প্রমাণ হিসেবে বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নের কোনো উল্লেখ নেই। ওই প্রত্যয়ন আবার কক্সবাজারের সন্দ্বীপ থেকে দেওয়া। সন্দ্বীপের মানুষ কীভাবে ঢাকার মিরপুর থেকে জন্মনিবন্ধন পেলেন, এর কোনো ব্যাখ্যাও নেই।

আরমানের আবেদনে সংযুক্তি হিসেবে বিবি ফাতেমা নামের এক নারীর জাতীয় পরিচয়পত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। যার সঙ্গে আরমানের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক পায়নি পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। যদিও আবেদনে আবার তাঁর মায়ের নাম দিলদার বেগম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর আরমান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিবন্ধিত।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন তথ্য সিস্টেম (বিডিআরআইএস) অনুযায়ী আরমানের জন্মসনদের আবেদন গ্রহণ ও প্রিন্ট করেছেন নিবন্ধন সহকারী বিলকিস আক্তার। আর অনুমোদন দিয়েছেন নিবন্ধক মাহমুদা আলী। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহীকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, জন্ম নিবন্ধক ও নিবন্ধন সহকারী দুজনই সজ্ঞানে, তথ্য যাচাই-বাছাই ও উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই অসৎ উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ আরমানকে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছেন। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

জালিয়াতির দায় এড়াতে ভুয়া জিডি

ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৩ থেকে গত ২ জানুয়ারি জন্মসনদ পান দক্ষিণ কোরিয়ার সিও জিনহি। আবেদন অনুযায়ী তাঁর জন্ম দক্ষিণ কোরিয়ার নামওয়াংঝু-সি তে ২০০৩ সালে। মায়ের নাম সিও ইনজু এবং পিতার নাম শহিদ। জিনহির মা ও বাবা দুজনেরই জাতীয়তা দক্ষিণ কোরিয়া। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটির আওতাধীন গেন্ডারিয়া এলাকায়।

এরপরও সিও জিনহির বর্তমান ঠিকানা ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন ২১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যবাড্ডা এলাকা দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য আবেদন করা হয়। ওই সনদের নিবন্ধক সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফিরোজ আলম এবং নিবন্ধন সহকারী নেসার আহমেদ।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের রেজিস্টার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্যমতে, জালিয়াতির মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না কর্মকর্তাদের অবৈধ কার্যক্রম। জালিয়াতির দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে জন্মনিবন্ধনের সার্ভার ‘হ্যাকড’ হয়েছে উল্লেখ করে নেসার আহমেদ বনানী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আর মিথ্যা ও জাল সনদ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তা বাতিলের জন্য রেজিস্টার জেনারেল কার্যালয় বরাবর চিঠি দেন নিবন্ধক আজিজুন নেছা। যিনি পরে ওই জাল সনদ সংশোধনের আবেদনে অনুমোদন করেন।

এ কারণে জাল সনদ প্রদানকারী জন্ম নিবন্ধক ফিরোজ আলম, নিবন্ধন সহকারী নেসার আহমেদ এবং ওই জাল সনদের ভুল সংশোধনের অনুমোদনের নিবন্ধক আজিজুন নেছার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ঢাকা উত্তর সিটিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

তবে সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আজিজুন নেছাকে অন্য আরেকটি সনদ জালিয়াতির ঘটনায় গত ২০ ফেব্রুয়ারি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। উজবেকিস্তানে জন্ম নেওয়া রাশিয়ার বংশোদ্ভূত অভিভাবকের সন্তান এলিনা তৌহিদকে জন্মসনদ দেওয়ার ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। যদিও একই ঘটনায় তাঁর অধীন নিবন্ধন সহকারী মাফরুজা সুলতানাকে চাকরিচ্যুত করেছিল সংস্থাটি।

অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যা বললেন

সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফিরোজ আলম প্রথম আলোকে বলেন, অঞ্চল-৩ থেকে যখন কোরিয়ার ওই নারীর জন্মসনদ প্রদান ও সংশোধন করা হয়, তখন তিনি ওই অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন না। সনদ প্রদান ও ভুল সংশোধন—দুটোই হয়েছে সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আজিজুন নেছার সময়ে। ওই সময়ে তিনি মিরপুরে অঞ্চল-৪–এর দায়িত্বে ছিলেন।

তিনি দায়িত্ব পালনের সময়ে অঞ্চল-৪ থেকে রোহিঙ্গার জন্মসনদ দেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে ফিরোজ আলম বলেন, জন্মসনদের আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সনদ প্রদানে যে পরিমাণ জনবলের প্রয়োজন, তা সিটি করপোরেশনে নেই। ফলে প্রচুর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের আবেদনের বিপরীতে চাপের মধ্যে তাঁদের কাজ করাতে হয়। এ কারণে অনিচ্ছাকৃত ভুলবশত ওই রোহিঙ্গা নাগরিকের জন্মসনদ দেওয়া হয়েছে।

জন্মসনদ জালিয়াতির ঘটনায় যুক্ত সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মাহমুদা আলীর বক্তব্য জানতে গত মে মাসের ৩০ ও ৩১ তারিখ দুই দিন মিরপুরে ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৪–এ গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। আর সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আজিজুন নেছা সাময়িক বরখাস্ত থাকায় সরাসরি তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ধরনের জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ। তিনি আজ প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশি নাগরিকেরা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের সহায়তায় জন্মনিবন্ধন করছেন, বিষয়টি মারাত্মক সংবেদনশীল এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির। বিষয়টি ধরা পড়ার পরও কর্তৃপক্ষ দোষী ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এটা খুবই দুঃখজনক।