নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকায় এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ফুটপাতে বাসচাপায় সহপাঠীর মৃত্যুর পর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমেছিলেন। ধীরে ধীরে ওই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় থেকে বড়দের ভুল-বিশৃঙ্খলা ধরিয়ে দেন। আন্দোলন চলাকালে মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনীতিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অনেকে সড়ক নিরাপদ ও বিশৃঙ্খলমুক্ত করতে নানা আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে যান। কিন্তু এখনো আগের মতোই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, মৃত্যু হচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলার প্রতিবাদে আজ সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে ওই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মোহিদুল ইসলাম দাউদ বলেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একপর্যায়ে সায়েন্স ল্যাব থেকে জিগাতলা মোড় পর্যন্ত এলাকাসহ ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ-যুবলীগ-শ্রমিক লীগের সন্ত্রাসীরা সংগঠিতভাবে হামলা করেছিল। আন্দোলন বানচাল করার জন্য তারা নিজেরা গুজব তৈরি করে এগুলো ঘটিয়েছিল৷ শুধু নিরপরাধ শিক্ষার্থীরাই নন, সাংবাদিকদের ওপরও হামলা করা হয়েছিল। আজকে সেই হামলার চার বছর পেরিয়ে গেলেও একজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। মন্ত্রী-আমলা-পরিবহন মালিক সমিতি, বিভিন্ন ইউনিয়ন-ফেডারেশনের মাফিয়াদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে ওই হামলার বিচার হয়নি। ওই সিন্ডিকেট গোটা সড়কব্যবস্থাকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

default-image

মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সংগঠক তানজিদ সৌরভ, শাহিদুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে ধানমন্ডি মডেল থানার সামনে যান তাঁরা। পুলিশের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের চারজনের প্রতিনিধিদলকে ভেতরে ডেকে নেওয়া হয়। প্রতিনিধিদল যখন থানায় অভিযোগ জমা দিচ্ছিল, তখন থানার বাইরে রবিউল নামের এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তর্কাতর্কি হয়। রবিউল শিক্ষার্থীদের থানার সামনে থেকে সরে যেতে বললে তা নিয়েই মূলত ওই তর্ক বাধে। তবে মিনিট দশেকের মধ্যেই প্রতিনিধিদল বেরিয়ে এলে মিছিল নিয়ে থানার সামনে থেকে চলে আসেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ধানমন্ডি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘২০১৮ সালের ২, ৪ ও ৬ আগস্টসহ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালে এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনকারীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। ওই সশস্ত্র হামলার অহরহ ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি। অথচ এ হামলা স্পষ্টতই নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারবিরোধী একটি অপরাধ। জাতীয় গণমাধ্যমে হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পরও প্রশাসনের এমন নির্লিপ্ততা আমাদের হতাশ করেছে। নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে হামলাকারীদের শনাক্ত করে তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

পরে ওই প্রতিনিধিদলে থাকা শিক্ষার্থী তানজিদ সৌরভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলার চার বছরেও হামলাকারীদের কাউকে গ্রেপ্তার বা বিচার করা হয়নি। ২০১৮ সালের ২, ৪ ও ৬ আগস্ট সন্ত্রাসীরা পুলিশি পাহারায় আমাদের ওপর হামলা করেছিল। পুলিশও হামলাকারীদের দলে ছিল। আমরা থানায় যাওয়ার পর পুলিশ জিজ্ঞাসা করেছে, কবে ও কোথায় হামলা হয়েছিল। চার বছর পর আমরা কেন অভিযোগ করতে এলাম, তা–ও তারা জানতে চেয়েছে। পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করেনি বলেই তো চার বছর পর আমাদের থানায় আসতে হলো।’

তানজিদ আরও বলেন, ‘আমরা কয়েকজন হামলাকারীর পরিচয় পুলিশকে জানিয়েছি। প্রশাসন যোগাযোগ করলে আমরা আরও অনেকের পরিচয় জানাতে পারব। আগামী সাত দিনের মধ্যে পুলিশ আমাদের অভিযোগপত্রের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করলে ২০১৮ সালের মতো আবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা আন্দোলনে যাব।’

এরপর সায়েন্স ল্যাব মোড় হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সেখানে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে হামলার বিচার দাবি করে নানা স্লোগান দেওয়া হয়।

default-image

এদিকে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির মধ্যে ছিল: দুর্ঘটনায় আহত সব যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; বৈধ-অবৈধ যানবাহনের চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈধতার আওতায় আনা ও বিআরটিএর সব কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা; সারা দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়-আধুনিক করা ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা; গণপরিবহনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি ও সহিংসতা বন্ধ করা; জনসাধারণের জন্য ফুটপাত-পদচারী সেতুসহ নিরাপদ চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পরিকল্পিত বাস স্টপেজ ও পার্কিং নির্মাণ ও তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন