দিনু আলম তুলে ধরেন সেই দিনের বিবরণ। তিনি তখন মুক্ত আলোকচিত্রী (ফ্রিল্যান্স) হিসেবে কাজ করতেন। বিক্ষোভ আর ঢাকা অবরোধের ছবি তুলতে সেদিন সকাল থেকেই তিনি উপস্থিত ছিলেন গুলিস্তান এলাকায়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় দাঙ্গা চলছিল। পুরানা পল্টন মোড় থেকে সচিবালয় হয়ে পুরো গুলিস্তান এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল সেদিন। বিক্ষোভকারীরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের দিকে লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করছিল। কাঁদানে গ্যাস আর গুলিও ছুড়ছিল তারা। জোহরের নামাজের আজান হওয়ার কিছু পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল এগিয়ে এলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। সেই মিছিলে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তাঁর গাড়ির কিছুটা সামনেই ছিলেন নূর হোসেন। সেই সময়ই তিনি সামনে থেকে নূর হোসেনের কয়েকটি ছবি তুলেছিলেন।

এত দিন পরে কেন ছবিটি নিজের তোলা বলে দাবি করে তিনি গণমাধ্যমের সামনে এলেন? জবাবে দিনু আলম বলেন, তিনি তখন নির্দিষ্ট কোনো পত্রিকায় কাজ করতেন না। ঘটনার পরে তিনি ছবিটি প্রিন্ট করে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে গেছেন। কিন্তু কেউ ছবিটি ছাপেনি। নূর হোসেনের শহীদ হওয়ার এক বছর পর ১৯৮৮ সালে প্রথম শাহাদতবার্ষিকীতে ছবিটি প্রথম ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক একতা পত্রিকায়। অবশ্য সেই বছরই তিনি কানাডায় চলে যান। পরে ১৯৯১ সালে ডাক বিভাগ ছবিটি নিয়ে শহীদ নূর হোসেন দিবসে দুই টাকা মূল্যের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

দিনু আলম বলেন, প্রবাসে জীবন–জীবিকায় ব্যস্ত থাকায় দীর্ঘকাল তাঁর দেশে ফেরা হয়নি। আর ছবিটিও বহু জন, বহু জায়গায় প্রকাশ করেছে। তবে ২০২০ সালে বিবিসির সাংবাদিক মোয়াজ্জেম হোসেন লন্ডন থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান নূর হোসেনকে নিয়ে বিবিসিতে তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করবেন। সেই সূত্রে নূর হোসেনের বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ লেখা সম্মুখ দৃশ্যের ছবি তোলার বিষয়টি তিনি জানতে এবং প্রতিবেদনে ছবিগুলো ব্যবহার করার অনুমতি চান। অবশ্য এর আগেই বিশিষ্ট আলোকচিত্রী পাভেল রাহমানের তোলা পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা নূর হোসেনের ছবিটি দেশে ও বিদেশের বহু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া তা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একটি প্রতীকী ছবি হয়ে উঠেছিল। তবে বিবিসির প্রতিবেদনে মোয়াজ্জেম হোসেন উল্লেখ করেন, ‘এই তরুণটি আসলে কে, সেটি একটি রহস্যই থেকে যেত, যদি না সাংবাদিক দিনু আলম সামনে থেকে নূর হোসেনের ছবিগুলো তুলতে পারতেন।’ কারণ, নূর হোসেন মারা যাওয়ার পরে তাঁর পরিবারকে কিছু না জানিয়েই স্বৈরাচারী সরকার দ্রুত তাঁকে দাফন করে ফেলে।

দিনু আলম জানান, ক্যামেরা ও ফিল্মটি তিনি দীর্ঘকাল ধরে যত্নে রেখেছেন। মূল নেগেটিভটি তিনি কানাডার ‘ব্ল্যাকস ফটোগ্রাফি টরন্টো’ থেকে ডিজিটাল কারিয়েছেন। বিবিসির প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই ছবির বিষয়টি তাকে আবার প্রবলভাবে নাড়া দেয়। তিনি ছবিগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অনুভব করেন। সেদিনের ঘটনা ও তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরার তাগিদ বোধ করেন। দেশে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর মধ্যে করোনা অতিমারির সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়। ফলে তখন দেশে আসা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হওয়ায় সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন।

দিনু বলেন, এর মধ্য তিনি এই ছবিগুলো নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে দিয়েছেন। তা ছাড়া ছবিগুলো ‘ফ্লিকার ডট কম’–এও দিয়ে রেখেছেন। যে কেউ ছবিগুলো ব্যবহার করতে পারবেন। সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে আলোকচিত্রী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করতে অনুরোধ করেন।

সেদিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে দিনু আলম বলেন, দুপুরে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে । জিপির পাশেই পুলিশের একটি ভ্যান ছিল। একপর্যায়ে সেখান থেকে ও পল্টন মোডের পুলিশ বক্স থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। নূর হোসেনসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। অপর দুজনের ছবিও তিনি তুলেছেন। তবে অন্য দুজন কারা, তাদের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, তা অজানাই রয়ে গেছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে এই সংবাদ সম্মেলনে দিনু আলম যে ক্যামেরায় ছবিগুলো তুলেছিলেন, সেই ‘ইয়াসিকা এফএক্স-৭ সুপার’ ক্যামেরা এবং ৩৫টি সাদা–কালো ছবির মূল নেগেটিভ, স্মারক ডাকটিকিট দেখান। ওই ছবিগুলো একটি বোর্ডে ওই এবং পর্দায় ছবিগুলো নিয়ে তৈরি করা ভিডিওটি প্রদর্শন করা হয়। ফলে আলোচনায়, স্মৃতিচারণায় আর ছবিতে যেন সাড়ে তিন দশক আগের গণ-আন্দোলনের উত্তাল দিনটিই ফিরে এসেছিল সংবাদ সম্মেলনকক্ষে।

এক প্রশ্নের জবাবে দিনু আলম বলেন, এই ছবিগুলোর জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন নিয়েছেন। তবে দেশে কপিরাইট আইনে নিবন্ধন করারও উদ্যোগ নেবেন।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই দিনু আলমের ছবির প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তাপ্রধান রেজওয়ানুল হক। দিনু আলমের পরিচিতি তুলে ধরেন দীপ্ত টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফুয়াদ চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, বিএফইউজের কোষাধ্যক্ষ খায়রুজ্জামান কামাল ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কাজিম রেজা।

আলোচকেরা বললেন, ‘দিনু আলমের ছবিগুলো আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য উপাদান। সেই সময় এসব ছবি গণমাধ্যমে ছাপানো কঠিন ছিল। স্বৈরশাসকের চাপ তো ছিলই, তা ছাড়া দিনু আলম সরাসরি কোনো পত্রিকায় যুক্ত ছিলেন না। পত্রপত্রিকাগুলো সাধারণত নিজেদের আলোকচিত্রীর ছবি ছাড়া বাইরের ছবি প্রকাশে তেমন আগ্রহী হয় না। আর এই ছবিগুলো তো ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ফলে সেই সময় ছবিগুলো ছাপা হয়নি। তবে এখন এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ায় আমাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে ছবিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’