রুপাই–সাজুর প্রেম–বিরহ জীবন্ত করে তুলেছিল নৃত্যাঞ্চল

রুপাই ও সাজুর ভূমিকায় ছিলেন নৃত্যশিল্পী জুটি শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নীপা। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, গুলশান তেজগাঁও লিংক রোড, ঢাকা। ১৭ এপ্রিলছবি: মীর হোসেন

রুপাই ফিরে এসেছিল তার গ্রামে। কিন্তু বড্ড দেরিতে। তার সাজু তখন চলে গেছে চিরকালের তরে। রেখে গেছে এক নকশিকাঁথা। যে কাঁথায় সে ফুটিয়ে তুলেছিল তার প্রেম, আনন্দ আর বিরহের বেদনা। কী করবে রুপাই এই নকশিকাঁথা নিয়ে?
পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের কালজয়ী কাব্য নকশিকাঁথার মাঠের রুপাই আর সাজুর সংগ্রামী জীবন, প্রেম আর বিয়োগান্ত পরিণতি দর্শকদের সামনে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন নৃত্যাঞ্চলের শিল্পীরা।

শুক্রবার ছুটির দিনের সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে যৌথ উদ্যোগে এই নৃত্যনাট্যের আয়োজন করেছিল এমডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ এবং স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড-এর ন্যাচারাল ওয়েলনেস ব্র্যান্ড মায়া।

পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের নাটক ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ এর মঞ্চায়ন। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, গুলশান তেজগাঁও লিংক রোড, ঢাকা। ১৭ এপ্রিল
ছবি: মীর হোসেন

‘মায়া বেঙ্গল ইন মোশন’ নামের এই আয়োজন এবার তৃতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো। কবি জসীমউদ্‌দীনের ১২৩তম জন্মদিন উদ্‌যাপন উপলক্ষে তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টিকে তুলে ধরা হয়েছিল দর্শকদের সামনে। কবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’। পৃথিবীর অনেক ভাষায় এটি অনূদিত হয়েছে।

নৃত্যনাট্যটি উপস্থাপন করে নৃত্যাঞ্চল। এই পরিবেশনার কিউরেটর হিসেবে ছিলেন নৃত্যশিল্পী আনিসুল ইসলাম হিরু। প্রধান দুই চরিত্র রুপাই ও সাজুর ভূমিকায় ছিলেন দেশের নন্দিত নৃত্যশিল্পী জুটি শিবলী মোহাম্মদ ও শামীম আরা নীপা। সহশিল্পীদের নিয়ে নান্দনিক নৃত্যশৈলী আর বর্ণাঢ্য সাজসজ্জায় তাঁরা দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছিলেন।

নক্সী কাঁথার মাঠ এক বিয়োগান্ত প্রেমের কাহিনি। গ্রামের তরুণ রুপাই। বলবান। খুব ভালো বাঁশি বাজায়। একদিন তার সঙ্গে দেখা হয় মাঠের ওপারের গ্রামের তরুণী সাজুর সঙ্গে। সেই থেকে দুজনের মন দেওয়া–নেওয়া। নানা ঘটনাক্রমের পর অবশেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হলো তাদের। শুরু হলো সুখের সংসার। কিন্তু রুপাই-সাজুর দুঃখের দিন শুরু হলো শিগগিরই। একদিন রুপাইদের ফসলের মাঠে হানা দিল দস্যুরা। ফসল রক্ষা করতে রুপাই তার সঙ্গীদের নিয়ে মাঠে গেল। সংঘর্ষ হলো তুমুল। এই ঘটনার চক্রে পড়ে গ্রামছাড়া হতে হলো রুপাইকে।

পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের নাটক ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ এর মঞ্চায়ন। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, গুলশান তেজগাঁও লিংক রোড, ঢাকা। ১৭ এপ্রিল।
ছবি: মীর হোসেন

ওদিকে রুপাইয়ের ফেরার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে দুর্বিষহ বিরহে কাতর হলো সাজু। সুইসুতোর ফোঁড়ে সাজু নকশিকঁথায় ফুটিয়ে তুলতে শুরু করল তার প্রেম, আনন্দের দিনের স্মৃতি আর বিরহের বেদনা। দিনে দিনে অন্তিম সময় ঘনিয়ে এল তার। আর তখন দীর্ঘদিনের পরে গ্রামে ফিরে রুপাই পেল সাজুর বোনা সেই নকশিকাঁথা। যে কাঁথায় ঢাকা ছিল সাজুর কবর। গ্রামবাসী পরদিন দেখল সেই কাঁথা জড়িয়ে সাজুর কবরে মাথা নিস্পন্দন পড়ে আছে রুপাই।

অনুষ্ঠানের শুরুতে দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে এমডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ও প্রকাশক রুমানা চৌধুরী বলেন, এমডব্লিউ ম্যাগাজিন ২০২২ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তাঁরা মায়ার সহযোগিতায় এই নৃত্যায়োজন করছেন। এবার তৃতীয়বারের মতো এই আয়োজন হলো।
স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মালিক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, স্কয়ারের জনপ্রিয় ন্যাচারাল ওয়েলনেস ব্র্যান্ড মায়া এমডব্লিউ ম্যাগাজিনের সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো এই আয়োজন করল। স্কয়ার দেশের শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এই সহায়তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের নাটক ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’–এর মঞ্চায়ন। আলোকি কনভেনশন সেন্টার, গুলশান তেজগাঁও লিংক রোড, ঢাকা। ১৭ এপ্রিল
ছবি: মীর হোসেন

নৃত্যনাট্যের সমাপনী বক্তব্যে কিউরেটর আনিসুল ইসলাম বলেন, বাংলা নববর্ষের পরে এবং ২৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের মাঝামাঝি সময়ে এই নৃত্যায়োজনটি করা হচ্ছে, এই দুটি দিবসকে উদ্‌যাপন করার জন্য। প্রথমবারে বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণের ভরতনাট্যম, কত্থক, মণিপুরি, ওডিশি প্রভৃতি নাচের পরিবেশনা নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। গত বছর দ্বিতীয় আয়োজনটি ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন নৃত্যনাট্যের অংশ নিয়ে। এবার পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীনের অমর সৃষ্টিকে মঞ্চে এনেছে নৃত্যাঞ্চল।

১৯৫৯ সালে প্রথমবার বুলবুল ললিতকলা একাডেমির উদ্যোগে ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ কাব্যটি নৃত্যনাট্যে রূপান্তর করা হয়। এর নির্দেশনা দিয়েছিলেন নৃত্যগুরু জি এ মান্নান। সংগীতায়োজন করেছিলেন ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই মূল নির্দেশনা ও সংগীতায়োজনেই এটি পরিবেশিত হলো।

দেশের নৃত্যশিল্পের চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে এমন আয়োজন ও সহায়তার জন্য উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানান কিউরেটর আনিসুল ইসলাম।