ভুয়া খবরের প্রচার রুখতে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তথ্য যাচাই করা এবং এ–সংক্রান্ত শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে চালু করার ওপর জোর দেন মশিহুর রহমান। তিনি বলেন, ভুয়া খবর রুখতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করা প্রয়োজন।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ২০২২ সালের প্রথম ৬ মাসে (জানুয়ারি–জুন) প্রায় ৩৮টি বিষয়ে দেশের ৭২টি সংবাদমাধ্যমে মোট ২৩২টি ভুয়া খবর প্রকাশ–প্রচার করা হয়েছে। এ তালিকায় প্রথম সারির অনেক সংবাদমাধ্যমও রয়েছে। এর ফলে পাঠক ও দর্শকের আস্থা কমছে। পেশাদারত্ব হারাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো। দিন দিন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জন–আস্থা ও গণতন্ত্রের জন্যও এসব ভুয়া খবর চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সেমিনারে ঢাকা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, অনলাইন মাধ্যমে সংবাদ সবার আগে প্রকাশের চাপ থাকে। এ চাপের কারণেও অনেক সময় ভুল হয়। তবে এই ভুল পাঠক–দর্শকের কাছে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালো বার্তা দেয় না। সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত নিজের কর্মীদের তথ্য যাচাই সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া, যাতে তাঁরা ভুল তথ্যের ফাঁদে পা না দেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপারসন শহীদুল হক বলেন, ‘তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ফ্যাক্ট–চেককে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের বিভাগের পাঠ্যক্রমে এ বছর থেকে ফ্যাক্ট–চেক যুক্ত হচ্ছে।’

এএফপি বাংলাদেশের ফ্যাক্ট–চেকবিষয়ক সম্পাদক কদরুদ্দীন শিশির বলেন, প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রতি মাসে বিভিন্ন ভুয়া খবর প্রকাশিত–প্রচারিত হয়। এসব খবরের বেশির ভাগের উৎস অন্য কোনো অনলাইনমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সংবাদকর্মীরা অনেক সময় এ তথ্য যাচাই করতে ব্যর্থ হন। এ সমস্যা সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা চালু করা প্রয়োজন। বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শিশুদের ভুয়া খবর ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ে জানাতে হবে, পড়াতে হবে।

একই মত দেন রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) শিক্ষক সুমন রহমান। তিনি বলেন, ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ায় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের এ–সংক্রান্ত শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

নাগরিক টিভির প্রধান প্রতিবেদক শাহনাজ শারমিন বলেন, সংবাদমাধ্যমগুলোর নিউজরুমে প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতার ফাঁকে অনেক সময় ভুল বা ভুয়া খবর প্রকাশিত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যদি এমন ভুল হয়, তাহলে সংশোধনী দিতে হবে। ভুল স্বীকার করে নিতে হবে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী এম. আনিছুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমগুলো অনলাইনে ভিউ বাড়াতে ভুয়া খবর, ভুয়া তথ্য প্রচার করছে। এসব বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর আরও সতর্ক থাকা উচিত।

সংবাদমাধ্যমগুলোয় ফ্যাক্ট–চেকিং সেল গড়ার পরামর্শ দিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এস এম রেজওয়ান উল আলম বলেন, অনেক সংবাদমাধ্যমেই ফ্যাক্ট–চেকিং সেল বলে কিছুই নেই। অথচ সংবাদমাধ্যমগুলোতে ভুয়া খবর হরহামেশাই চোখে পড়ে। এ ছাড়া ভুয়া নিউজের তথ্যভান্ডার করাও প্রয়োজন। যাঁরা ভুয়া খবর ছড়ান, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কাবেরী মৈত্রেয় বলেন, সংবাদমাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচারিত হলে পাঠকের অনাস্থা তৈরি হয়। তাই ভুয়া খবর প্রচারিত বা প্রকাশিত হওয়ার দায় সংবাদকর্মীদেরই নিতে হবে। তাঁরা ব্যবস্থা নিলে এ ধরনের ভুল কমবে।

সেমিনারে প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন বলেন, সাময়িক আর্থিক লাভের আশায় অনেক সংবাদমাধ্যম হয়তো ভুয়া খবর ছড়াতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সঠিক নিউজ সংবাদমাধ্যমের প্রতি পাঠক–দর্শকের আস্থা বাড়ায়। দিন শেষে ব্যবসাও বাড়ে।

শওকত হোসেন আরও বলেন, ফ্যাক্ট–চেকিং এখন অনেক জটিল হয়েছে। অনলাইন মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় আপস করতে হয়। তবে ভুল হলে সংশোধন করতে হবে। ভুল স্বীকার করে নিতে হবে। সংশোধনপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা দূর করতে হবে।

এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, দৈনিক বাংলার প্রধান প্রতিবেদক মোর্শেদ নোমান, এশিয়া ফাউন্ডেশনের দেশীয় প্রতিনিধি কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শাহ মো. নাসির খান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ খান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমরান হোসেন প্রমুখ।