পাল্টে মৃত নবজাতক দেওয়ার অভিযোগ, এখন হবে ডিএনএ পরীক্ষা

প্রতীকী ছবিএআই দিয়ে তৈরি

রাজধানীর ডেলটা হেলথকেয়ার যাত্রাবাড়ী লিমিটেডে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৪২ মিনিটে ভর্তির পর নবজাতকটির পরিচিতি ছিল ‘সন অব রিমা’ বা রিমার ছেলে হিসেবে। দুই দিন পর ২৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশুটি মারা যায়। হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যুসনদেও একই পরিচিতি ছিল।

এরপর রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে দাফনের পর পরিবারটির কাছে থাকা নবজাতকের ছবি এবং ভিডিও দেখতে গিয়ে শিশুটির মা ইয়াসমিন ফেরদৌসি রিমার মনে হয়, এ শিশু তাঁর নয়। হাসপাতাল থেকে অন্য মৃত সন্তান হস্তান্তরের অভিযোগে গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করেন এই নারী। এখন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য শিশুটির লাশ কবর থেকে তোলা হবে।

ইয়াসমিন ফেরদৌসি রিমা প্রথম আলোকে বলেন, অন্য একটি ক্লিনিকে গত ২৬ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে অস্ত্রোপচারে সন্তানের জন্ম দেন তিনি। জন্মের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ডেলটা হেলথকেয়ার যাত্রাবাড়ী লিমিটেডে ভর্তি করা হয়, তিনি ভর্তি ছিলেন আগের ক্লিনিকেই। ডেলটায় নবজাতকদের বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) সেভাবে বাচ্চাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে ছেলে মারা গেল। মারা যাওয়ার পরও শিশুটির লাশ ইয়াসমিনকে দেখতে দেননি পরিবারের সদস্যরা। ফলে ছেলেকে খুব কাছে থেকে দেখারই সুযোগ পাননি তিনি। লাশ দাফনের পর ছেলের জন্মের পর তোলা এবং মৃত্যুর পর তোলা ছবি এবং ভিডিও দেখতে গিয়ে তাঁর মনে সন্দেহ দেখা দেয়।

এই মায়ের ভাষায়, তাঁর ছেলের ডায়াপারের মধ্যে শুকিয়ে পড়ে যাওয়া নাভি (মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে নাড়ির মাধ্যমে যুক্ত থাকে, যাকে আম্বিলিকা কর্ড বলে) দেখতে পান। এত কম সময়ে সাধারণত নাড়ি শুকিয়ে পড়ে যায় না এবং হাসপাতালের সিসিটিভির ভিডিওতেও গরমিল দেখা যায়।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সন্তান বদলের এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলছে। সেই সঙ্গে তারা বলছে, আইনি প্রক্রিয়ায় যা হবে, তা-ই তারা মেনে নেবে।

একটি ক্লিনিকে শিশুটির জন্ম হয়েছিল গত ২৬ ডিসেম্বর। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে পরদিন ভর্তি করা হয় যাত্রাবাড়ীর ডেলটা হেলথকেয়ারে। দুই দিন পর হাসপাতাল থেকে মৃত শিশুটিকে দেওয়া হয় পরিবারের কাছে।

ইয়াসমিন ফেরদৌসির বাসা পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ায়। তাঁর স্বামীর নাম মো. শাহিন। যাত্রাবাড়ীতে অটোরিকশার ব্যবসা হয়েছে তাঁর। এই দম্পতির আগেও সন্তান মারা গেছে। বর্তমানে জীবিত তিন মেয়ের পর এবার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ইয়াসমিন ফেরদৌসির শারীরিক বিভিন্ন জটিলতা ছিল। তাই অস্ত্রোপচারের আগেই চিকিৎসক বলেছিলেন, সন্তানকে এনআইসিইউতে রাখতে হতে পারে।

ইয়াসমিন ফেরদৌসি বলেন, ‘মেডিসিন চলছে বলে ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে দেওয়া হয়নি। যেদিন ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারব বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা, ওই দিনই তো বলা হলো ছেলের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। ছেলেকে লাইফ সাপোর্টে নেয়। আমি ছেলেকে সেভাবে কাছেই নিতে পারিনি। আর ক্লিনিকে জন্মের পর আমার ছেলের নাভি ক্লিপ দিয়ে আটকানো ছিল।’

মো. শাহিন প্রথম আলোকে বলেন, গত ২৯ ডিসেম্বর ডেলটা হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয়, ছেলের অবস্থা খারাপ। ফুসফুসে রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। রক্তদাতা আনতেও বলা হয়েছিল। ২০ মিনিটের মধ্যে রক্তদাতা হাসপাতালে গেলেও পরে আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তারপর রাতে জানানো হয় মারা গেছে ছেলে।

ছবিতেই স্পষ্ট শাহিন ও ইয়াসমিন ফেরদৌসির সন্তান বেশ ছোট ছিল এবং মৃত বাচ্চা তুলনামূলক বড় ছিল। নাভির বিষয়টি আছে।
সিরাজুল হক ফয়সাল, আইনজীবী

হাসপাতাল থেকে মৃত্যুসনদ দেওয়ার পর খুব কম সময়ের মধ্যে লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন পরিবারের সদস্যরা।

শাহিন জানান, ছেলের জন্মের পর এবং মারা যাওয়ার পর কিছু ছবি তোলা হয়েছিল এবং ভিডিও করা হয়েছিল। ছেলেকে গোসল করানোর সময়ও ভিডিও করা হয়। ৩০ জানুয়ারি জুরাইন কবরস্থানে দাফনের পর সবাই যখন একটু ফুসরত পান, তখন ছবি ও ভিডিও দেখতে গিয়ে সন্দেহ দেখা দেয় যে অন্য একটি মৃত শিশু তাদের দেওয়া হয়েছে।

মামলায় অপরাধের প্রমাণ গোপন করা, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে ডেলটা হেলথকেয়ারের এনআইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মুজিবর রহমান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগ নিয়ে শাহিন প্রথমে যাত্রাবাড়ী থানা এবং পরে শ্যামপুর থানায় যান। শ্যামপুর থানায় অভিযোগ নেওয়া হয়নি। তাঁরা ডেলটা হাসপাতালেও যান কয়েক দফায়। প্রথমে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দিতে না চাইলে মামলা করার হুমকি দিলে তখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দেয়।

মামলায় ডেলটা হেলথকেয়ার হাসপাতালটির কনসালট্যান্ট চিকিৎসক, ব্যবস্থাপকসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে
ছবি: এজাহারের অনুলিপি

ফুটেজের বর্ণনা দিয়ে শাহিন বলেন, ২৮ ডিসেম্বর (রাত ১০টা ৫৭ মিনিট) ছেলের নির্ধারিত বিছানায় সে ছিল না। রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে অন্য একটি নবজাতককে ওই বিছানায় দেখা যায়। পরদিন ওই পাল্টে দেওয়া নবজাতককেই পরিবারটির কাছে মৃত অবস্থায় হস্তান্তর করা হয়।

সন্দেহ দেখা দেওয়ার পর যে ক্লিনিকে ছেলের জন্ম হয়েছিল, সেখানেও খোঁজ নেন শাহিন। তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর ঢাকার আদালতে মামলা করেন তিনি।

মৃত নবজাতকের পরিবারের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বাচ্চা হস্তান্তরের সময় অভিযোগ না করে অনেক পরে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।
অধ্যাপক মুজিবর রহমান, চিকিৎসক, ডেলটা হেলথকেয়ার

অপরাধের প্রমাণ গোপন করা, প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা এ মামলায় ডেলটা হেলথকেয়ার যাত্রাবাড়ী লিমিটেডের এনআইসিইউ বিভাগের প্রধান এবং হাসপাতালটির কনসালট্যান্ট চিকিৎসক অধ্যাপক মো. মুজিবর রহমান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নবজাতকের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির আইনজীবীরা। আইনজীবী সিরাজুল হক ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ছবিতেই স্পষ্ট শাহিন ও ইয়াসমিন ফেরদৌসির সন্তান বেশ ছোট ছিল এবং মৃত বাচ্চা তুলনামূলক বড় ছিল। নাভির বিষয়টি আছে। হাসপাতালের ফুটেজ বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, কোনো একজন নার্স নবজাতকটিকে কোথাও নিয়ে যান। তারপর দীর্ঘ সময় পরে আবার কেউ অন্য নবজাতককে বিছানায় রেখে যান। তবে কে নিয়ে গেলেন বা কে রেখে গেলেন, তা ফুটেজে স্পষ্ট নয়।

ডেলটার চিকিৎসক অধ্যাপক মুজিবর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৃত নবজাতকের পরিবারের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বাচ্চা হস্তান্তরের সময় অভিযোগ না করে অনেক পরে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।’

হাসপাতালটির ব্যবস্থাপক সুলতান আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতালটি চালু হয়েছে। সুনামের সঙ্গে চলছে হাসপাতালটি। প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য কেউ পরিবারটিকে প্রভাবিত করে মামলা করাতে পারে।

শিশুটির ডিএনএ টেস্টসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় সত্যটা বের হয়ে আসবে বলে আশা করছেন অধ্যাপক মুজিবর রহমান।

মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আদালত গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার দিন ঠিক করেছিল। পরে তা পিছিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শাকিল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল বা ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজসহ অন্যান্য হার্ডড্রাইভ সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য লাশ কবর থেকে তোলা, ডিএনএ পরীক্ষা করার বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন।