ঝরঝর বৃষ্টির পরে প্রাণবন্ধের গান
সারা দিনের মেঘলা আকাশ থেকে বেলা শেষে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরিয়ে নামল সন্ধ্যা। বৃষ্টির সুরের রেশ কাটতে না কাটতে যেন এর সঙ্গে মিলে গেল প্রেম আর পরমের সাধনার সুরের ধারা। ভাটির দেশের গানের রাজা বলে খ্যাত হাসন রাজার গানের সুর ও বাণী এক ভিন্ন ভাবাবেগের জগতে নিয়ে গেল শ্রোতাদের।
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনের সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ের আলোকি কনভেনশন সেন্টার মিলনায়তনে বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে ‘প্রাণবন্ধের সনে’ শীর্ষক এই সংগীতানুষ্ঠান যৌথভাবে আয়োজন করে এমডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ এবং স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ন্যাচারাল ওয়েলনেস ব্র্যান্ড ‘মায়া’। অনুষ্ঠানটি করা হয়েছিল বাংলা লোকসংগীতের মরমি ধারার অন্যতম সাধক গীতিকবি ও শিল্পী দেওয়ান হাসন রাজার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে উৎসর্গ করে।
হাসন রাজার জন্ম সুনামগঞ্জে ১৮৫৪ সালে আর ১৯২২ সালে নির্বাপিত হয়েছিল জীবনপ্রদীপ। কিন্তু তাঁর সুর ও বাণী আলোকিত করে রেখেছে আমাদের সংগীত ভুবন। সিলেটের উপভাষা মেশানো সহজ–সরল বাংলায় হাসন রাজা তাঁর গানে একদিকে যেমন সৃষ্টিতত্ত্ব, সুফিবাদ, পরম দয়াল স্রষ্টার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন, তেমনি প্রকাশ করেছেন নর–নারীর চিরন্তন প্রণয়ের তীব্র আবেগ। শতাব্দীকাল পেরিয়েও তাঁর গানের এই গভীর মরমি ভাবধারা ও মর্মস্পর্শী সুর বিমোহিত করে রেখেছে শ্রোতাদের। গতকাল নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পশ্চিমা যন্ত্রানুষঙ্গের মেলবন্ধনে নতুন আঙ্গিকে হাসন রাজার সেসব কালজয়ী গান উপস্থাপন করলেন রাজধানীর শ্রোতাদের সামনে। এর সংগীত নির্বাচন, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিলেন শিল্পী শায়ান চৌধুরী অর্ণব। তিনি গান গেয়েও শুনিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমডব্লিউ ম্যাগাজিন বাংলাদেশ–এর সম্পাদক ও প্রকাশক রুমানা চৌধুরী। তিনি বলেন, হাসন রাজার কালজয়ী গানের ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজনে সহায়তা দেওয়ার জন্য তিনি স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, এ দেশের সংস্কৃতির কেন্দ্রে রয়েছে লোকসংগীত। এই গানে নিজেদের সত্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। স্কয়ার টয়লেট্রিজ লোকসংগীতের প্রচার–প্রসার ও চর্চায় দীর্ঘদিন থেকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ‘বাউলিয়ানা’ আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবসহ বিভিন্ন আয়োজনে যুক্ত রয়েছে। তিনি সংস্কৃতি ও সৃজনশীল চর্চার প্রতি স্কয়ারের নতুন ব্র্যান্ড মায়ার প্রতিশ্রুতির কথা বলেন।
আলোচনার পরেই গান
সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার পরেই শুরু হয় গানের পালা। মঞ্চ সাজানো হয়েছিল বিরাট আকারের এক বটবৃক্ষের ডিজিটাল কাটআউট দিয়ে। এর নেপথ্যে মঞ্চজুড়ে ডিজিটাল পর্দা। সেখানে গানের সঙ্গে মিলিয়ে কখনো ভেসে উঠেছে সিলেট অঞ্চলের সজল প্রকৃতি, হাওরের হিজল-করচের নিবিড় সবুজ সমাবেশ। সেই পটভূমিতে সারিবদ্ধ যন্ত্রশিল্পীদের সামনে এসে শায়ান চৌধুরী অর্ণব শ্রোতাদের জানালেন, একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তাঁরা হাসন রাজার গান শোনাবেন শ্রোতাদের। রাজার জনপ্রিয় গানগুলোর সঙ্গে কিছু অপ্রচলিত কথা ও সুরের গানও থাকবে তাঁদের পরিবেশনায়।
সুরের এই যাত্রা শুরু করেছিলেন মাখন মিয়া ‘হাসন রাজা কয় আমি কিছু নয় রে আমি কিছু নয়/ অন্তরে বাহিরে দেখি কেবল দয়াময়’ গান দিয়ে। পরে গেয়েছেন ‘কানাই তুমি খেল খেলাও কেমন/ রঙের রঙ্গিলা কানাই’।
অনুষ্ঠানে ভাবের গানের পরে প্রেমের গান শুনিয়েছেন কানিজ খন্দকার মিতু। তিনি গেয়েছেন ‘পিরিতে কইরাছে দেওয়ান’। পরের গানটি ছিল বহুল পরিচিত ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইছে’।
প্রেমে আর মরমিয়া ভাবাবেশে মাখামাখি ছিল পরিবেশ। বগা তালেব মঞ্চে উদার সুরে ‘থাকতে চাই ঠাকুরের কাছে/ ঠাকুর আমায় পুছে না’ গান পরিবেশন করেন। পরের গানে পরিবেশ বদলে দিলেন তিনি ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’ গেয়ে।
হামিদা বানুও শ্রোতাদের ভাসিয়েছেন আধ্যাত্মিকতার ভাবাবেগে অপ্রচলিত দুটি গানে—‘হাসন রাজা হাওয়ার মানুষ’ ও ‘মাবুদ আল্লাহর লাগি হাসন রাজা হইছে বাউলা’ পরিবেশন করে।
এবার গানের পালা অর্ণবের। এতক্ষণ তিনি শিল্পীদের সঙ্গে গিটার বাজিয়েছেন। তিনি শুরুতে শোনালেন ‘বাউলা কে বানাইলো রে’। পরে গেয়েছেন হাসন রাজার সেই অতি জনপ্রিয় গান ‘লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার’।
‘নেশা লাগিল রে’ গেয়ে গানের গতিমুখ প্রেমের স্রোতে ফেরালেন অনিমেষ রায়। তাঁর পরের গানটি ছিল ‘আগুন লাগাইয়া দিল মনে’।
মঞ্চের নেপথ্যের দৃশ্যে বটবৃক্ষের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সুরমা নদী। একক কণ্ঠের শিল্পীরা সবাই এলেন মঞ্চে। তাঁদের সঙ্গে যন্ত্রবাদনে ছিলেন সুদীপ্ত বর্ধন, মিঠুন চক্রবর্তী, বুনো, সাইদুল ইসলাম, কৌশিক, শুভেন্দু দাস, জালাল আহমেদ, আবির ও সহযোগী কণ্ঠে আবিরা ও জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁরা যন্ত্রের মনোমুগ্ধকর বাদন আর কণ্ঠের মাধুর্যে যেন নদীর স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন ভাটি অঞ্চলের মনমতানো সুর, ‘ছাড়িলাম হাসনের নাও রে’। সেই সুরের রেশ নিয়েই ঘরে ফিরে গেলেন শ্রোতারা।