এ পুকুরে সন্তানদের পিঠে নিয়ে এপাড়-ওপাড় সাঁতার কাটতেন কাজী মোতাহার হোসেন। পুকুরপাড়টি ছিল নজরুলেরও পছন্দের জায়গা। প্রায় শত বছর আগের সে পুকুরের দৈর্ঘ্য–প্রস্থ কত ছিল, তা অজানা। বর্তমানে পুকুরের মাপ দৈর্ঘ্যে ১৩৭ আর প্রস্থে ১১০ ফুট। মাঝখানের গভীরতা ২৫ ফুট। তবে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা শহরের পানির স্তর নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের চেহারা হয়ে যায় দুর্ভিক্ষতাড়িত হাভাতে কাঙালের মতো। পানি তো থাকেই না, উপরন্তু চারপাশের খোলা জায়গায় বাড়তে থাকে ময়লার স্তূপ।

তলানিটা নাড়াচাড়া হতে শুরু করলে পাম্প ছেড়ে কৃত্রিমভাবে পানি দিয়ে হলেও স্বভাব রক্ষা করতে হয় শতবর্ষী পুকুরের। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ প্রথম আলোকে জানালেন, ‘জলাশয়টি বহু ঘটনার সাক্ষী। অনেক সময়ই এগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমির নতুন ভবন তৈরির সময় বিশেষভাবে তাই নির্দেশ দেওয়া ছিল, কোনোভাবেই যেন জলাশয় নষ্ট না হয়। এ জন্য চারপাশে রিটেইনিং ওয়াল বা ঠেস দেওয়া দেয়াল তৈরি করা হয়েছে।‌’

বাংলা একাডেমির প্রয়াত মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী এক চৈত্র মাসে ভেকু বসিয়ে মাটি তুলিয়েছিলেন খনন করতে। সম্প্রতি পুকুরের সৌন্দর্যবর্ধনে চারপাশ দিয়ে লাগানো হয়েছে মহাভৃঙ্গরাজগাছ। আর পদ্মপাতাগুলো ছড়িয়ে যেতে না যেতেই পাড় থেকে উঁকিঝুঁকি শুরু করেছে লালরঙা কলাবতীরা।

নতুন ভবনের দিকে পুকুরের এপাড়ে লাগানো হয়েছে এই গাছগুলো। প্রাকৃতিক ভাবটা বজায় রাখতে গোটা পুকুর বাঁধানো হয়নি। এতে চৌবাচ্চার মতো দেখাবে বলে আশঙ্কার কথা জানালেন একাডেমির প্রশাসন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম। তবে এই প্রাকৃতিক ভাব রক্ষার ব্যাপারটা কিছুটা গোলমেলে হয়ে গেল দুটি খবরে।

একাডেমি প্রাঙ্গণে কয়েকটি উৎসুক রাজহাঁস ছিল, যারা মাঝেমধ্যে আত্মবিশ্বাসী ভাব প্রদর্শন করে অতিথিদের ভড়কে দিয়েছে। লিফটের ভেতর টুক করে ঢুকে যাওয়ার ইতিহাসও আছে তাদের। সম্প্রতি সেই হাঁসদের বিরুদ্ধে অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ একটু বেশি জোরালো হয়েছিল।

যখন-তখন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে প্রবেশ করছিল ওরা। সেই সঙ্গে আছে নিজেদের পুরীষ দিয়ে গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগ। এসব গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে তিন হাঁসকেই ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। লঘু পাপে গুরুদণ্ড পেয়েছে কি না, তা অবশ্য বলা কঠিন।

‘অভদ্র হাঁস’দের জন্য মন খারাপ করা ঠিক হবে না। কর্তৃপক্ষ এই শতবর্ষী পুকুরে বাতি দেওয়া ফোয়ারা বসানোর কথা ভাবছে। আরেকটি তথ্য শোনা গেল একজন পরিচালকের কাছ থেকেই। প্রাকৃতিক ভাব রক্ষার্থে পুকুরে বাঁশের খুঁটিতে কয়েকটি প্লাস্টিকের মাছ ও মাছরাঙা পাখি বসানোর কথা চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ। এতে খরচ বেশি হবে না বলে প্রথম আলোকে আশ্বস্ত করলেন তিনি।

তৎকালীন বর্ধমান হাউস বর্তমান বাংলা একাডেমির পুরো প্রাঙ্গণই নানা ঘটনার ইতিহাসের সাক্ষী। সে প্রাচীরের ভেতরের একমাত্র জলাশয়টি শূন্যগর্ভ হলে আপনা থেকে হাহাকার জন্মায়।

তেমনি প্রাকৃতিকভাব রক্ষার চেষ্টায় কৃত্রিম ফুল, পাখি, প্লাস্টিকের মাছ ও মাছরাঙা বসানোর কথা শুনলে আতঙ্ক হয় কর্তৃপক্ষের বাস্তুভাবনা, ঐতিহ্য সংরক্ষণের রুচি নিয়ে। কৃত্রিম পাখির উড়ে যাওয়ার চেয়ে পুকুরের পানিতে দুটো বড় গাছের ছায়া অনেক বেশি প্রকৃতিবান্ধব। পাশাপাশি একটি নামকরণ হোক পুকুরটির। লেখা থাকুক এর শত বছরের ইতিহাসের সারাৎসার।

রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন