মেট্রােরেলে খুব সকালে যাত্রী কম, রাতে ভিড় থাকলেও চলাচল থেমে যায় আগেই
মেট্রোরেলের চলাচল গত বছরের অক্টোবরের শেষ দিকে এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সকালে আধা ঘণ্টা ও রাতে আধা ঘণ্টা করে সময় বাড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ভোরে বাড়তি আধা ঘণ্টায় যাত্রী হয় না বললেই চলে, অথচ রাতের শেষ আধা ঘণ্টায় যাত্রীর চাপ থাকে অনেক বেশি থাকে।
রাতে মেট্রোরেলের সর্বশেষ ট্রেনেও ঠাসাঠাসি থাকছে। অনেককে ট্রেনে উঠতে না পেরে বাস ধরতে হচ্ছে। এ অবস্থায় মেট্রোরেলে সকালে বাড়তি সময় না রেখে রাতে সময় আরও বাড়ানোর দাবি উঠেছে যাত্রীদের মধ্য থেকে।
ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে আছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সংস্থাটির যাত্রী চলাচল–সংক্রান্ত তথ্যে সকালে কম যাত্রী ও রাতে বেশি যাত্রী চলাচলের তথ্য উঠে এসেছে।
গত ১৯ অক্টোবর থেকে সকাল ও রাত মিলে এক ঘণ্টা বাড়তি সময় মেট্রোরেল চলাচল করছে। এ সময়ের মধ্যে দুই ট্রেনের মাঝখানের বিরতিও (ফ্রিকোয়েন্সি) কমানো হয়েছে।
ভোরে যাত্রী হাতে গোনা, রাতে শেষ ট্রেনেও ভিড়
ডিএমটিসিএলের দেওয়া তথ্য বলছে, ১১ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত মাত্র ১৫১ জন যাত্রী মেট্রোরেলে চলাচল করেছেন। এ সময় দুটি ট্রেন চলাচল করেছে। ভোরের প্রথম আধা ঘণ্টায় কয়েকটি স্টেশনে যাত্রী একেবারেই ছিল না। উত্তরা মধ্য স্টেশনে সবচেয়ে কম আটজন যাত্রী এবং উত্তরা দক্ষিণ স্টেশনে মাত্র একজন যাত্রী ভোরের ট্রেনে যাতায়াত করেছেন। তবে ফার্মগেটের পর থেকে মতিঝিল অংশে সকালে তুলনামূলকভাবে কিছু যাত্রী চলাচল করেছেন।
এখন সব মিলিয়ে যাত্রী কিছুটা কম। আগামী মাসে বাড়তি সময়ের যাত্রী চলাচল বিশ্লেষণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে রাতে চাহিদা থাকলে সময় বাড়ানো হবে। সকালের বাড়তি সময়টা দরকার আছে কি না, সেটিও বিশ্লেষণ করে দেখা হবে।ফারুক আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিএমটিসিএল
এর বিপরীতে রাতের বাড়তি আধা ঘণ্টায় যাত্রী উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ১১ জানুয়ারি রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মেট্রোরেল ৩ হাজার ৭৪৯ জন যাত্রী পরিবহন করেছেন। রাতের শেষ আধা ঘণ্টায় প্রায় সব স্টেশন থেকেই কিছু না কিছু যাত্রী ওঠানামা করেছেন। ওই দিন সারা দিনে যাত্রী পরিবহন করেছে ৪ লাখের কিছু বেশি। অর্থাৎ পুরো দিনে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২৩ হাজার ৫০০ যাত্রী পরিবহন করেছে।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের এই হিসাবের বাইরেও আরও যাত্রী রয়েছেন, যাঁরা স্টেশনেই ঢুকতে পারেননি। রাতে চলাচলের সময় বাড়লে তাঁরাও মেট্রোরেলেই ভ্রমণ করতেন।
ডিএমটিসিএল সূত্র বলছে, অতিরিক্ত শীত ছাড়াও এখন অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীতকালীন বন্ধ। এ ছাড়া নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকার মানুষের অনেকেই বাইরে চলে গেছেন। এ জন্য এই সময়ে যাত্রী কিছুটা কম। গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে গড়ে পাঁচ লাখ যাত্রী চলাচল করেছেন। এখন তা একটু কমেছে।
কর্মজীবীদের চাহিদা রাতে
রাতে মেট্রোরেলের সময় বাড়ানোর পক্ষে কথা বলছেন কর্মজীবীরা। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের দোকান কর্মী মো. শাহজালাল প্রতিদিন পল্লবী থেকে সকালে মেট্রোরেলে করে কাজে আসেন। তবে রাতে কাজ শেষ করতে করতে প্রায়ই শেষ ট্রেন মিস হয়ে যায়। বর্তমানে শাহবাগ হয়ে শেষ ট্রেন যায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে।
শাহজালাল প্রথম আলোকে বলেন, কখনো শেষ ট্রেন ধরতে পারেন, কখনো পারেন না। যেদিন মেট্রোরেল পেয়ে যান, সেদিন রাত ১১টার আগেই বাসায় পৌঁছে যান। আর মেট্রো না পেলে বাসায় পৌঁছাতে সাড়ে ১১টা বা আরও দেরি হয়। রাতে মেট্রো চলাচল বাড়লে তাঁর মতো আরও অনেক কর্মজীবীর সুবিধা হতো।
সময় বাড়ানোর পর যাত্রী ও আয় বেড়েছে। ডিএমটিসিএলের তথ্য বলছে, গত ১৯ অক্টোবর সকাল ও রাতে মেট্রোরেলের চলাচল এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে এখন প্রথম ট্রেন ছাড়ছে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে, আগে তা ছাড়া হতো সকাল ৭টা ১০ মিনিটে।
অন্যদিকে উত্তরা উত্তর থেকে রাতে সর্বশেষ ট্রেন ছাড়ছে ৯টা ৩০ মিনিটে। ১৯ অক্টোবরের আগে তা ছাড়া হতো রাত ৯টায়। মতিঝিল স্টেশন থেকে প্রথম ট্রেন ছাড়ে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে। আগে তা ছাড়ত সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে। অন্যদিকে রাতে মতিঝিল থেকে সর্বশেষ ট্রেনটি ছাড়ে ১০টা ১০ মিনিটে। আগে শেষ ট্রেন ছাড়ত ৯টা ৪০ মিনিটে।
ডিএমটিসিএল বলছে, গত ১৯ অক্টোবর থেকে ১৯ জানুয়ারি সকাল ও রাতের বাড়তি এক ঘণ্টায় ৮ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী মেট্রোরেলে চলাচল করেছেন। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হয়েছে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সংস্থাটির আয়ও বেড়েছে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সব মিলিয়ে যাত্রী কিছুটা কম। আগামী মাসে বাড়তি সময়ের যাত্রী চলাচল বিশ্লেষণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে রাতে চাহিদা থাকলে সময় বাড়ানো হবে। সকালের বাড়তি সময়টা দরকার আছে কি না, সেটিও বিশ্লেষণ করে দেখা হবে।
বর্তমানে মেট্রোরেল উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। চলতি বছরের শেষের দিকে মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা আছে ডিএমটিসিএলের।
২০১২ সালে অনুমোদনের সময় মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।